কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে সেন্টমার্টিনের পথে পর্যটকবাহী জাহাজ, প্রথমদিনেই ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

নুরুল আমিন হেলালী:

দীর্ঘ প্রতিক্ষার পর অবশেষে পর্যটন নগরী কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়াস্থ বিআইডব্লিউটিএ ঘাট থেকে পর্যটকবাহী তিনটি জাহাজ দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছে। তবে প্রথমদিনেই পর্যটকদের কাছে কাঁচা টিকিট বিক্রয়ের দায়ে কেয়ারি সিন্দাবাদ কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা গুনতে হয়েছে।

সোমবার (১ ডিসেম্বর) সকাল সোয়া ৭টার দিকে চলতি মৌসুমে কক্সবাজার–সেন্টমার্টিন রুটে প্রথম এই যাত্রায় রয়েছেন প্রায় ১২ শতাধিক পর্যটক।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কাকপক্ষীর পেখম খুলে কুয়াশায় মোড়ানো ভোর থেকেই ঘাটে আসতে শুরু করেন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেন্টমার্টিনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসা এমভি কর্ণফুলী এক্সপ্রেস, এমভি বার আউলিয়া ও কেয়ারি সিন্দাবাদ নামের জাহাজগুলোর যাত্রীরা।

নিয়ম মোতাবেক ক্রয়কৃত টিকিট প্রদর্শন করে জাহাজের আসন গ্রহণ করার আগে প্রত্যেক যাত্রীর হাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ তুলে দেওয়া হয় ‘পরিবেশবান্ধব’ পানির বোতল।

ঢাকা থেকে ৩০ জনের পর্যটক গ্রুপ নিয়ে আসা মোঃ শাহজাহান বলেন, এই বছর প্রথমবারের মতো সেন্টমার্টিন যাচ্ছি, সত্যিই খুব রোমাঞ্চকর লাগছে এই ভ্রমণ। প্রশাসনের তৎপরতা এবং সংশ্লিষ্টদের আতিথেয়তা খুবই প্রশংসনীয়।

সূত্র মতে, সরকারি নির্দেশনা মেনে প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যেতে পারবেন অনুমতিপ্রাপ্ত জাহাজগুলোতে। পরবর্তী দুই মাস (৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত) থাকছে দ্বীপে রাত্রিযাপনের সুযোগ।

যাত্রার ক্ষেত্রে পর্যটকদের বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের স্বীকৃত অনলাইন প্ল্যাটফর্ম থেকে টিকিট সংগ্রহ করতে হবে। প্রতিটি টিকিটে ট্রাভেল পাস ও কিউআর কোড থাকবে। কিউআর কোড ছাড়া টিকিট নকল হিসেবে গণ্য হবে।

জাহাজ মালিকদের সংগঠন ‘সি ক্রুজ অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, ৬টি জাহাজকে প্রশাসন অনুমতি দিয়েছে, যাত্রীর আনুপাতিক হার বিবেচনায় আজ ৩টি জাহাজ যাচ্ছে। জোয়ার–ভাটা ও নদীর নাব্যতা বিবেচনায় প্রতিদিনের যাত্রার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে। সকালে কক্সবাজার শহর থেকে ছেড়ে যাওয়া পর্যটকবাহী জাহাজগুলো বিকেলে সেন্টমার্টিন থেকে ছেড়ে আবার কক্সবাজারে ফিরে আসবে।

খুলনা থেকে পরিবার নিয়ে আসা ডাঃ মারুফ বলেন, সেন্টমার্টিন সকলের পছন্দের জায়গা। এর আগেও গিয়েছি, তবে আগে টেকনাফ থেকে দ্রুত যাওয়া যেত, কিন্তু এখন কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে যেতে হচ্ছে। আসলে এত দূরত্বের পথ পাড়ি দিয়ে যাওয়া একটু কষ্টের হলেও স্বস্তি আসবে দ্বীপে পৌঁছলে, কারণ সেখানে প্রাকৃতিক প্রাশান্তি পাওয়া যায়।

ঘাটে প্রবেশের সময় তল্লাশির পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা নিয়োজিত রয়েছেন।

ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের প্রধান অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, পর্যটকরা যাতে নির্বিঘ্নে সেন্টমার্টিন যাত্রা উপভোগ করতে পারেন সে লক্ষ্যে পুলিশের সার্বক্ষণিক তৎপরতা অব্যাহত আছে। এছাড়া সমুদ্রপথে জাহাজে এবং সেন্টমার্টিনে আমাদের সদস্যরা নিরাপত্তা দেবে এবং যেকোনো প্রয়োজনে সহায়তা দিতে আমরা প্রস্তুত বলেও তিনি আশ্বস্ত করেন।

সেন্টমার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত অক্টোবরে ১২টি নির্দেশনা জারি করেছে সরকার।

দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় রাতের বেলা সৈকতে আলো জ্বালানো, উচ্চ শব্দে অনুষ্ঠান, বারবিকিউ পার্টি, কেয়াবনে প্রবেশ, কেয়াফল সংগ্রহ ও ক্রয়–বিক্রয় এবং সামুদ্রিক কাছিম, পাখি, প্রবাল, রাজকাঁকড়া ও অন্যান্য জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ।

সৈকতে মোটরসাইকেল, সি-বাইকসহ মোটরযান চলাচল বন্ধ এবং নিষিদ্ধ পলিথিন ও একবার ব্যবহার্য প্লাস্টিক ব্যবহারও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ ঘাটে প্রথম যাত্রার প্রারম্ভে পরিদর্শনে এসে জেলা প্রশাসক আব্দুল মান্নান বলেন, নির্দেশনাগুলো বাস্তবায়নে জেলা প্রশাসন বদ্ধপরিকর, এক্ষেত্রে অবশ্যই পর্যটক ও সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা করতে হবে। এদিকে আজ থেকে সেন্টমার্টিনগামী পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ায় পর্যটক বরণে প্রস্তুত পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী ও স্থানীয়রা। আবারও প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পাবে প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *