কক্সবাজারে শত কোটি টাকার সরকারি জমি দখলের পাঁয়তারা, আদালতের আদেশও উপেক্ষিত

অনলাইন ডেস্ক:

কক্সবাজার শহরের কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও স্থিতাবস্থা সংক্রান্ত আদেশের মধ্যে সরকারি জমিতে নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, শত কোটি টাকা মূল্যের সরকারি জমিতে রাতের আঁধার কিংবা দিনের বেলায় টিনের বেড়ার আড়ালে একের পর এক স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে।

কলাতলী পুলিশ বক্স থেকে ওশান প্যারাডাইস-সংলগ্ন এলাকায় ইতোমধ্যে প্রায় ১১টি কাউন্টার, ট্রাভেল এজেন্সি ও চায়ের দোকান গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। একই এলাকায় আরও ১৯টি দোকান নির্মাণের কাজ চলছে। এর মধ্যে প্রায় ১০টির নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দোকান বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে প্রতি দোকান থেকে ৫ থেকে ১২ লাখ টাকা পর্যন্ত অগ্রিম ‘সালামি’ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মাসিক প্রায় ২০ হাজার টাকা ভাড়ার চুক্তি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরেজমিনে ওই এলাকায় টিনের বেড়ার ভেতরে কয়েকজন শ্রমিককে নির্মাণকাজ করতে দেখা যায়। নির্মাণকাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে নিরাপত্তাকর্মী ও শ্রমিকরা স্পষ্ট কোনো তথ্য দিতে পারেননি।

নির্মাণস্থলের মাঝখানে থাকা একটি সাইনবোর্ডে আদালতের নির্দেশনার উল্লেখ রয়েছে। সেখানে নতুন কোনো স্থাপনা নির্মাণ না করার নির্দেশনার কথাও লেখা রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আদালতের এমন নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও একই জায়গায় নতুন স্থাপনা নির্মাণের কাজ চলছে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রসাদ প্যারাডাইসের মালিক ইউসুফ আবদুল্লাহ জমিটির মালিকানা দাবি করলেও বৈশাখী রেস্টুরেন্টের মালিক কামরুলের নেতৃত্বে সেখানে দখল-বাণিজ্য চলছে।

ডলফিন মোড়সংলগ্ন বৈশাখী রেস্টুরেন্ট এলাকার ঘের দেওয়া জমির পরিমাণ ৪ দশমিক ৫০ একর বলে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই জমিতে টাঙানো একটি নোটিশেও ৪ দশমিক ৫০ একর জমির কথা উল্লেখ করে সেখানে প্রবেশ নিষেধ করা হয়েছে।

এদিকে কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে আগে বরাদ্দ দেওয়া বেশ কিছু প্লট শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগে বাতিল করা হয়েছে। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৩ সালে কলাতলী হোটেল-মোটেল জোনে ১৩০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে ৮৭টি প্লটের মধ্যে ৫৭টির বরাদ্দ বাতিল করা হয়। ওই বাতিল হওয়া প্লটগুলোর মধ্যে সংশ্লিষ্ট জমিটিও রয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে বৈশাখী রেস্টুরেন্টসংলগ্ন ৪ দশমিক ৫০ একর জমিটি ঠিক কোন দাগ, খতিয়ান ও প্লটের অন্তর্ভুক্ত এবং বর্তমানে এর বৈধ মালিকানা বা বরাদ্দের অবস্থা কী—তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বৈশাখী রেস্টুরেন্টের মালিক কামরুল ইসলাম বলেন, জমিটি তাদের নামে বরাদ্দ দেওয়া প্লট এবং সরকার সেই বরাদ্দ বাতিল করেনি। স্থানীয় কিছু ব্যক্তি জমিটি দখলের চেষ্টা করছেন দাবি করে তিনি বলেন, নিজেদের বরাদ্দকৃত জায়গা সুরক্ষিত রাখতেই তারা সেখানে ঘেরাবেড়া দিচ্ছেন।

কক্সবাজারের কলাতলী ও সৈকতসংলগ্ন এলাকায় সরকারি জমি, বাতিল ইজারা এবং অবৈধ স্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিলতা রয়েছে। কলাতলী, সুগন্ধা ও লাবণী পয়েন্ট এলাকায় সরকারি খাসজমি, গণপূর্তের জমি এবং বাতিল ইজারার জমি নিয়েও বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনিক জটিলতার তথ্য উঠে এসেছে।

এর আগে কলাতলীতে আদালতের স্থিতাবস্থা থাকা জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ নিয়েও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। ২০২২ সালে কলাতলীর গণপূর্তের একটি মাঠ থেকে দেড় শতাধিক অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের তথ্যও প্রকাশিত হয়।

এ অবস্থায় আদালতের নির্দেশনা থাকার পরও নতুন স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে, এর সঙ্গে কারা জড়িত এবং এসব স্থাপনা থেকে কারা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন—তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার দাবি উঠেছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন, বাতিলকৃত সরকারি প্লটে যেকোনো ধরনের স্থাপনা নির্মাণ সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়টি জানার পর সহকারী কমিশনারকে (ভূমি) আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করবে বলেও জানান তিনি।

এখন প্রশাসনের এই অবস্থানের পর কলাতলীতে কথিত স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ হয় কি না এবং সরকারি জমি দখলের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে কী ধরনের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, সেটিই দেখার বিষয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *