অনলাইন ডেস্ক:
১৯৯৬ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাতে আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুল দখল করে তালেবান। সেদিন রাতেই জাতিসংঘের কাবুল মিশনের কম্পাউন্ডে ঢুকে সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ ও তাঁর ভাইকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় তালেবান। কয়েক ঘণ্টা পর কাবুলের কেন্দ্রস্থলে একটি ল্যাম্পপোস্টে তাঁদের ক্ষতবিক্ষত মরদেহ ঝুলতে দেখা যায়।
নাজিবুল্লাহর এই পরিণতি আফগানিস্তানের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও গৃহযুদ্ধের এক নির্মম প্রতীক হয়ে ওঠে। একসময় সোভিয়েত-সমর্থিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ছিলেন তিনি। পরে প্রেসিডেন্ট হয়ে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহারের পরও কয়েক বছর ক্ষমতা ধরে রাখেন।
১৯৯২ সালে মুজাহিদিনদের তীব্র লড়াইয়ের মুখে তাঁর সরকারের পতন হয়। দেশ ছাড়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়ে এরপর প্রায় চার বছর কাবুলে জাতিসংঘের আশ্রয়ে ছিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত তালেবান কাবুল দখল করার পর সেখান থেকেই তাঁকে তুলে নিয়ে হত্যা করা হয়।
১৯৪৭ সালে আফগানিস্তানের পাকতিয়া প্রদেশের গারদেজ শহরে জন্ম নেন মোহাম্মদ নাজিবুল্লাহ আহমাদজাই। পশতুন বংশোদ্ভূত নাজিবুল্লাহর শৈশব ও শিক্ষাজীবনের বড় একটি অংশ কাটে কাবুলের হাবিবিয়া হাইস্কুল এবং ভারতের জম্মু-কাশ্মীরের বারামুল্লার সেন্ট জোসেফস হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে।
১৯৬৪ সালে কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসাশাস্ত্রে ভর্তি হন তিনি এবং ১৯৭৫ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করেন। তবে চিকিৎসা পেশায় না গিয়ে রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় ১৯৬৫ সালে আফগানিস্তানের কমিউনিস্ট রাজনৈতিক দল পিপলস ডেমোক্রেটিক পার্টি অব আফগানিস্তানে (পিডিপিএ) যোগ দেন নাজিবুল্লাহ। পরবর্তী সময়ে দলটি ‘পারচাম’ ও ‘খালক’—এই দুই গোষ্ঠীতে বিভক্ত হলে তিনি পারচামপন্থী নেতা বাবরাক কারমালের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন।
সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই দুবার কারাবরণ করেন নাজিবুল্লাহ।
১৯৭৮ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে পিডিপিএর খালকপন্থীরা ক্ষমতা দখল করে। এরপর দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরু হলে ১৯৭৯ সালের ডিসেম্বরে আফগানিস্তানে বিপুলসংখ্যক সেনা পাঠায় সোভিয়েত ইউনিয়ন। তারা খালকপন্থী সরকার সরিয়ে পারচামপন্থীদের ক্ষমতায় বসায়।
১৯৮০ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত আফগান সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা ‘খাদ’-এর প্রধান ছিলেন নাজিবুল্লাহ। তাঁর নেতৃত্বে সংস্থাটি দেশটির অন্যতম শক্তিশালী গোয়েন্দা কাঠামোয় পরিণত হয়।
সরকারবিরোধীদের গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও গোপন বন্দিশালায় রাখার অভিযোগ ছিল খাদের বিরুদ্ধে। মুজাহিদিন ও সরকারবিরোধীদের দমন করতে সংস্থাটির ভূমিকার কারণে নাজিবুল্লাহ তাঁদের কাছে ভয় ও ঘৃণার প্রতীকে পরিণত হন। বিরোধীদের কেউ কেউ তাঁকে ‘কাবুলের কসাই’ বলে অভিহিত করতেন।
১৯৮৯ সালে আফগানিস্তান থেকে সোভিয়েত সেনা প্রত্যাহার শেষ হয়। তবে সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থ, জ্বালানি ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করে নাজিবুল্লাহর সরকার আরও কয়েক বছর টিকে থাকে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর তাঁর সরকারের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে।
১৯৮৬ সালে বাবরাক কারমালকে সরিয়ে পিডিপিএর সাধারণ সম্পাদক করা হয় নাজিবুল্লাহকে। ওই বছরের নভেম্বরের মধ্যে কারমাল প্রেসিডেন্ট পদ থেকেও সরে যান। ১৯৮৭ সালে প্রেসিডেন্ট হন নাজিবুল্লাহ।
ক্ষমতায় এসে সংঘাত বন্ধ ও রাজনৈতিক সমঝোতার উদ্যোগ নেন তিনি। জাতীয় আপস কমিশন গঠন, ছয় মাসের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এবং মুজাহিদিনদের সঙ্গে আলোচনার আহ্বান জানান। অস্ত্র সমর্পণ করে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রস্তাবও দেওয়া হয়।
১৯৮৭ সালের নভেম্বরে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করে বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার সুযোগ দেওয়া হয়। দেশের নামও পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘রিপাবলিক অব আফগানিস্তান’।
তবে তত দিনে আফগানিস্তানের রাজনৈতিক ও সামরিক সংঘাত এতটাই গভীর হয়ে গিয়েছিল যে এসব উদ্যোগে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি।
নাজিবুল্লাহর সরকার পতনের পর তাঁকে আফগানিস্তান থেকে নিরাপদে বের করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। তৎকালীন জাতিসংঘের বিশেষ দূত বেনন সেভানের মধ্যস্থতায় তাঁকে ভারতে পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তাঁর স্ত্রী ফাতানা নাজিবুল্লাহ ও তিন কন্যা আগেই নয়াদিল্লিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী নাজিবুল্লাহ তাঁর ভাই জেনারেল আহমাদজাইকে নিয়ে কাবুল বিমানবন্দরের দিকে রওনা হন। জাতিসংঘের একটি চার্টার্ড বিমান তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছিল। কিন্তু বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাহিনী তাঁদের যেতে বাধা দেয়। ফলে নাজিবুল্লাহ কাবুলের জাতিসংঘ কম্পাউন্ডে ফিরে আশ্রয় নেন।
এরপর ১৯৯২ সালে মুজাহিদিনরা কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়। কিন্তু জাতিসংঘের কূটনৈতিক সুরক্ষার কারণে নাজিবুল্লাহকে সরাসরি তুলে নেওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় চার বছর তিনি জাতিসংঘের কম্পাউন্ডেই অবস্থান করেন।
এদিকে মুজাহিদিনদের বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ ও প্রাণহানি ঘটে।
১৯৯৪ সালে মোল্লা মোহাম্মদ ওমরের নেতৃত্বে তালেবানের উত্থান ঘটে। মুজাহিদিনদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত আফগানিস্তানে শান্তি ও কঠোর ইসলামি শরিয়া আইন প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সংগঠনটি দ্রুত শক্তিশালী হয়।
১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ তালেবান আফগানিস্তানের বড় একটি অংশের নিয়ন্ত্রণ নেয়। ২৬ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় কাবুলের প্রতিরক্ষায় থাকা সরকারি ও মুজাহিদিন বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে। পরদিন ভোরে তালেবান কাবুলের নিয়ন্ত্রণ নেয়।
ক্ষমতা দখলের পর তালেবান যোদ্ধারা জাতিসংঘের কম্পাউন্ডে ঢুকে নাজিবুল্লাহ ও তাঁর ভাইকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়। পরে তাঁদের হত্যা করা হয়।
তাঁদের মরদেহ একটি ট্রাকের পেছনে বেঁধে কাবুলের রাস্তায় ঘোরানো হয়। এরপর প্রেসিডেন্ট ভবনের কাছের একটি ট্রাফিক ল্যাম্পপোস্টে নাজিবুল্লাহ ও তাঁর ভাইয়ের মরদেহ ঝুলিয়ে দেওয়া হয়।
নাজিবুল্লাহকে হত্যার পেছনে তাঁর সাবেক শাসনামলের ভূমিকা, মুজাহিদিনদের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাত এবং আফগানিস্তানের গৃহযুদ্ধের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা—এসব বিষয়কে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তাঁর হত্যাকাণ্ড আফগানিস্তানের কয়েক দশকের যুদ্ধ, ক্ষমতার পালাবদল ও রাজনৈতিক সহিংসতার অন্যতম প্রতীক হয়ে আছে।