কিশোর অপরাধ দমনে কঠোর অবস্থানে নারায়ণগঞ্জ পুলিশ — পুলিশ সুপার

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী, ব্যুরো চিফ: 

“আজকের শিশু–কিশোরই আগামী দিনের রাষ্ট্রের নেতৃত্ব দেবে। তারা যদি সৎ, মানবিক ও নৈতিক মূল্যবোধে বেড়ে ওঠে, তবেই আমরা একটি উন্নত, মাদকমুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়তে পারব।” — একান্ত আলাপচারিতায় নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন এই বার্তা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, কিশোর অপরাধ আজ শুধু একটি আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়—এটি একটি গভীর সামাজিক সংকট। সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের দায়িত্বশীল আচরণ ও সচেতনতা দিয়েই এ সমস্যা রোধ করা সম্ভব।

পুলিশ সুপার বলেন, কিশোর অপরাধের মূল শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। পরিবারের দরিদ্রতা, অর্থের প্রাচুর্যতা, সামাজিক বৈষম্য, পারিবারিক অবহেলা, নৈতিক শিক্ষার অভাব, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও মাদকের প্রলোভন—সব মিলিয়েই কিশোররা বিপথে যাচ্ছে।

“একদিকে দরিদ্রতার কারণে মৌলিক চাহিদা পূরণ না হওয়া, অন্যদিকে অর্থের বাড়াবাড়ি ও লাগামহীন স্বাধীনতা—দুই-ই কিশোর অপরাধ বাড়াচ্ছে। কেউ হতাশা থেকে অপরাধে জড়াচ্ছে, কেউ ক্ষমতার অপব্যবহার করছে,” — বলেন এসপি জসীম উদ্দীন।

তিনি আরও যোগ করেন, কিশোর বয়সে মানসিক পরিবর্তন দ্রুত ঘটে, আর এই সময়ের ভুল বন্ধুত্ব বা ভুল দিকনির্দেশনাই একজন কিশোরকে আজীবনের জন্য অন্ধকারে ঠেলে দিতে পারে।

নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার বলেন, “একজন সন্তানের প্রথম বিদ্যালয় হলো তার পরিবার। বাবা–মা যদি সময় দেন, ভালোবাসেন, সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে—এগুলো নিয়মিত খোঁজ নেন, তাহলে কোনো সন্তান বিপথে যেতে পারে না।”

তিনি আরও বলেন, পরিবারে সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি করতে হবে। সন্তানদের সামনে বড়দের নৈতিক আচরণ, পারিবারিক ঐক্য, ধর্মীয় ও সামাজিক মূল্যবোধ উপস্থাপন করতে হবে। সন্তান যেন পরিবারের ভেতর থেকেই শৃঙ্খলা, সম্মান ও দায়িত্বশীলতা শেখে।

এসপি জসীম উদ্দীন বলেন, “কিশোরদের জন্য খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কোনো বিকল্প নেই। তাদের মানসিক বিকাশের জন্য আনন্দদায়ক, ইতিবাচক পরিবেশ সৃষ্টি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

তিনি জানান, নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ইতোমধ্যে বিভিন্ন স্কুল–কলেজ ও কমিউনিটি পর্যায়ে “কিশোর সংলাপ”, “কমিউনিটি পুলিশিং ফোরাম” ও “কিশোর ক্লাব” গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে তরুণরা তাদের সমস্যার কথা খোলামেলা আলোচনা করতে পারে এবং ভুল পথে না যায়।

“আমরা চাই, প্রতিটি স্কুলে যেন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা ও মানবিক মূল্যবোধভিত্তিক কার্যক্রম নিয়মিত হয়। কিশোররা ব্যস্ত থাকলে, তারা অপরাধে জড়াবে না,”— বলেন তিনি।

বর্তমানে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও সামাজিক মাধ্যমের অবাধ ব্যবহারের কারণে কিশোর অপরাধের ধরন পাল্টে যাচ্ছে। কেউ অনলাইন জুয়া, কেউ সাইবার বুলিং, আবার কেউ গ্যাং কালচারে জড়িয়ে পড়ছে।

এসপি জসীম উদ্দীন বলেন, “ইন্টারনেট ব্যবহার খারাপ নয়, কিন্তু অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার বিপজ্জনক। অভিভাবকরা যদি তাদের সন্তানদের ডিজিটাল জীবনের অংশ না হন, তাহলে অন্য কেউ তাদের জীবনে ঢুকে পড়বে—এটাই আজকের বাস্তবতা।”

নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ ইতোমধ্যে কিশোর গ্যাং শনাক্ত ও তাদের পুনর্বাসনে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট মাঠপর্যায়ে সচেতনতামূলক সভা করছে। পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্রের সঙ্গে জড়িত কিশোর অপরাধীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চলছে।

এসপি জসীম উদ্দীন বলেন,

“আমরা কাউকে শাস্তি দিতে নয়, সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতেই চাই। কিশোররা দেশের সম্পদ—তারা অপরাধী নয়, বরং পথহারা। তাই আইন প্রয়োগের পাশাপাশি পুনর্বাসন ও কাউন্সেলিংয়ের ওপর আমরা বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি।”

পুলিশ সুপার মনে করেন, কিশোর অপরাধ রোধ শুধু পুলিশের পক্ষে সম্ভব নয়। সমাজের প্রতিটি মানুষকে এই লড়াইয়ে অংশ নিতে হবে। স্কুল-কলেজ, শিক্ষক, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সমাজকর্মী, জনপ্রতিনিধি—সবাই যদি একসঙ্গে কাজ করে, তাহলে কিশোর অপরাধ রোধ করা সম্ভব।

তিনি বলেন,

“যে কোনো সন্দেহজনক কর্মকাণ্ড, কিশোর গ্যাংয়ের তথ্য বা অপরাধ প্রবণতার ইঙ্গিত পেলে সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনকে জানান। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।”

কিশোর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জেলা পুলিশের বিশেষ উদ্যোগের কথা জানিয়ে এসপি বলেন, ইতিমধ্যে বিভিন্ন থানা এলাকায় সচেতনতামূলক সভা, স্কুল পর্যায়ে আলোচনা, ওয়ার্ডভিত্তিক কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।

“আমরা চাই, নারায়ণগঞ্জের প্রতিটি কিশোর হোক নিরাপদ, নৈতিক ও দায়িত্ববান নাগরিক। যে কোনো মূল্যে কিশোর অপরাধমুক্ত নারায়ণগঞ্জ গড়তে আমরা বদ্ধপরিকর,” —দৃঢ় কণ্ঠে বলেন তিনি।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জসীম উদ্দীন বলেন,

“বর্তমান প্রজন্ম যদি মানবিক, মাদকমুক্ত ও নৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে গড়ে ওঠে, তাহলে আগামীর নারায়ণগঞ্জ হবে স্বপ্নের শান্তিপূর্ণ জেলা। সমাজের প্রবীণরা যদি কিশোরদের পাশে দাঁড়ান, পরিবার যদি নজর রাখে, আর সমাজ যদি দায়িত্ব নেয়—তাহলেই কিশোর অপরাধের অন্ধকার থেকে আমরা আলোর পথে ফিরতে পারব।”

তিনি নারায়ণগঞ্জবাসীর প্রতি আহ্বান জানান—

“আপনার চারপাশে কোনো কিশোর গ্যাং বা অপরাধ প্রবণতা দেখলে পুলিশকে জানান। আপনার একটি তথ্য একটি জীবন বাঁচাতে পারে।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *