মোঃআনজার শাহ:-
দলের ঐক্য, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক শক্তিকেই বিএনপির সবচেয়ে বড় সম্পদ উল্লেখ করে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাকারিয়া তাহের সুমন বলেছেন, “দলের মধ্যে ঐক্য থাকলে সরকার শক্তিশালী হবে, আর বিএনপি ঐক্যবদ্ধ থাকলে কুমিল্লার অগ্রগতিকেও কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না।”
মঙ্গলবার (১ সেপ্টেম্বর) বিকেলে কুমিল্লা জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপি আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের শুরুতেই গৃহায়ণমন্ত্রী মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, নব্বইয়ের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদ এবং জুলাইয়ের আন্দোলনে আত্মত্যাগকারীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। একই সঙ্গে বিএনপির চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক সংগ্রামের কথাও তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলার সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। হামলা, মামলা, নির্যাতন ও নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও বিএনপির নেতাকর্মীরা আন্দোলন-সংগ্রাম থেকে সরে যাননি। গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যাঁরা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান জানিয়ে দলকে আরও সুসংগঠিত ও শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তিনি।
‘বিএনপির সবচেয়ে বড় শক্তি দলের ঐক্য’:জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, বর্তমানে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে। একটি সরকারের সবচেয়ে বড় শক্তি তার রাজনৈতিক সংগঠন। দলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি হলে সরকারও দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তিগত পদ-পদবি কিংবা কে কী পেলেন এসবের চেয়ে দলের স্বার্থ ও ঐক্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, “বিএনপির একজনই চেয়ারম্যান ও নেতা—তারেক রহমান। তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখে প্রত্যেক নেতাকর্মীকে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে কাজ করতে হবে।”
তিনি আরও বলেন, মানুষের প্রকৃত পরিচয় পদ নয়, তার কাজ। পদ সাময়িক হলেও মানুষের জন্য করা কাজ ও দলের প্রতি ত্যাগ ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে থাকে।
দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের ধৈর্য ধারণের আহ্বান জানিয়ে গৃহায়ণমন্ত্রী বলেন, সবাইকে একসঙ্গে সংসদ সদস্য, মন্ত্রী কিংবা জেলা সভাপতি করা সম্ভব নয়। তবে পদ না পেলেও দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ কর্মীদের মূল্য কখনো কমে না। দীর্ঘদিন যারা আন্দোলন-সংগ্রামে অবদান রেখেছেন, তাঁদের যথাযথ মূল্যায়ন অবশ্যই করা হবে।
কুমিল্লার উন্নয়নে ঐক্যের বিকল্প নেই:কুমিল্লার অতীত ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, শিক্ষা, প্রশাসন, চিকিৎসা ও প্রকৌশলসহ নানা ক্ষেত্রে একসময় কুমিল্লা দেশের শীর্ষ অবস্থানে ছিল। কিন্তু নানা কারণে আজ সেই অগ্রযাত্রা প্রত্যাশিত গতিতে এগোচ্ছে না।
তিনি বলেন, দেশের অন্যান্য শহরের উন্নয়ন দেখে কুমিল্লার বর্তমান অবস্থার সঙ্গে তুলনা করলে আক্ষেপ জাগে। নিজেদের মধ্যে বিভক্তি ও প্রতিযোগিতার কারণে উন্নয়নের গতি ব্যাহত হয়েছে। তাই ব্যক্তি নয়, কুমিল্লার বৃহত্তর স্বার্থকে সামনে রেখে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
গৃহায়ণমন্ত্রী দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “আপনারা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকেন, কুমিল্লার উন্নয়ন কেউ থামিয়ে রাখতে পারবে না।”
কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়নে আশাবাদ:দীর্ঘদিনের জনদাবি কুমিল্লাকে বিভাগ ঘোষণার বিষয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি বলেন, এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, দলীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই কুমিল্লার উন্নয়ন এবং বিভাগ বাস্তবায়নের পথ সুগম করবে।
‘সরকার এখন স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটছে’:বর্তমান সরকারের সামনে অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত, জ্বালানি সংকট এবং বৈশ্বিক পরিস্থিতির মতো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের সময় সরকার একটি কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলায় সরকারকে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। ফলে অনেক সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে জনপ্রিয় না হলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য তা প্রয়োজনীয়।
তিনি বলেন, “আমরা এখন স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটছি। এই পরিস্থিতি চিরস্থায়ী নয়। ইনশাআল্লাহ আমরা সংকট কাটিয়ে উঠব।”
পরিকল্পিত উন্নয়ন ও মানুষের কল্যাণে সরকারের অঙ্গীকার:
সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে গৃহায়ণমন্ত্রী বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ, সাশ্রয়ী আবাসন, স্মার্ট সিটি, পরিবেশ সংরক্ষণ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত উন্নয়নকে সরকার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তিনি জানান, সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আবাসনের সুযোগ সৃষ্টি, শহরগুলোকে আরও পরিকল্পিত ও বাসযোগ্য করে গড়ে তোলা এবং উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোকে আধুনিক ও সক্ষম করে তুলতে সরকার কাজ করছে। পাশাপাশি শিক্ষার মানোন্নয়ন, কৃষকদের সহায়তা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিও আরও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর থাকার আহ্বান:সরকার ও দলকে দুর্বল করার নানা অপচেষ্টা রয়েছে দাবি করে তিনি নেতাকর্মীদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তির অনিয়মের দায় যেন পুরো দলের ওপর না আসে। কেউ অন্যায় করলে তাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না; দলীয় শৃঙ্খলা বজায় রাখতেই হবে।
স্থানীয় নির্বাচন সামনে রেখে ঐক্যের বার্তা:সামনের স্থানীয় সরকার নির্বাচনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ বিভেদ থাকলে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে না। একটি পদ বা মনোনয়নকে কেন্দ্র করে সম্পর্কের অবনতি না ঘটিয়ে দলের সিদ্ধান্ত মেনে সবাইকে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি বলেন, “একজনের জন্য আরেকজনকে ছোট করবেন না। ব্যক্তিকে নয়, দলকে প্রাধান্য দিন। দল শক্তিশালী হলে প্রত্যেক নেতাকর্মীর মর্যাদাও বৃদ্ধি পাবে।”
ত্যাগী নেতাকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা:বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামে জীবন উৎসর্গকারী, কারাবরণকারী এবং নির্যাতনের শিকার নেতাকর্মীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, তাঁদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ দল রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে। তাই ব্যক্তিগত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হিসাব না কষে দলের ভবিষ্যৎ ও দেশের স্বার্থে সবাইকে কাজ করতে হবে।
‘কুমিল্লায় দৃশ্যমান পরিবর্তন আসবে’:বক্তব্যের শেষাংশে কুমিল্লার উন্নয়ন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে গৃহায়ণমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের প্রত্যাশা পূরণে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
তিনি বলেন, “আপনারা পাশে থাকুন, ঐক্যবদ্ধ থাকুন। ইনশাআল্লাহ কুমিল্লার উন্নয়ন হবে, কুমিল্লা বিভাগও বাস্তবায়িত হবে। আগামী দিনে কুমিল্লার মানুষ দৃশ্যমান পরিবর্তনের সাক্ষী হবে।”
তিনি আরও বলেন, “ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, পদের চেয়ে দায়িত্ব বড়, আর পাওয়ার চেয়ে ত্যাগের মূল্য অনেক বেশি।” এ সময় তিনি বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে দেশ ও মানুষের কল্যাণে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান।
উল্লেখ্য, বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এ আলোচনা সভায় কুমিল্লা জেলা ও মহানগর বিএনপি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী অংশ নেন। সভায় দলের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কর্মপরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।