কেতন আগরওয়াল হত্যা পরিকল্পিত, ৫ হাজার ৫৩ পৃষ্ঠার চার্জশিট

অনলাইন ডেস্ক:

ভারতের মহারাষ্ট্রের পুনের লোহাগড় দুর্গ থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালকে হত্যার ঘটনায় ৫ হাজার ৫৩ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দিয়েছে পুলিশ। চার্জশিটে বলা হয়েছে, কেতনের বাগদত্তা সিয়া গোয়েল ও তার প্রেমিক চেতন চৌধুরি সুপরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করেন। এ হত্যার পরিকল্পনা সম্পর্কে চেতনের বন্ধু রিতেশ হাঙ্গেও জানতেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

শনিবার ওড়গাঁও মাভাল আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং ঘটনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে। মামলায় অভিযুক্ত তিনজনকেই গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

পুনে গ্রামীণ পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, আদালতে জমা দেওয়া চার্জশিটে পাঁচজন প্রত্যক্ষদর্শীসহ ১০০ জনেরও বেশি মানুষের জবানবন্দি উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রমাণ হিসেবে মোবাইল ফোনের ডেটা, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, ছবি, কল রেকর্ড এবং প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণও আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে।

চার্জশিটে গত ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে ২৬ বছর বয়সী কেতন আগরওয়ালের মৃত্যুর পেছনের কথিত ষড়যন্ত্রের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

চার্জশিট অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারিতে ব্যবসায়ী কেতন আগরওয়ালের সঙ্গে সিয়া গোয়েলের বাগদান হয়। আগামী নভেম্বরে জয়পুরে তাঁদের বিয়ের আয়োজন হওয়ার কথা ছিল। তবে পারিবারিক কারণে বাগদানে সম্মতি দিলেও বিয়েতে সিয়ার মত ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কারণে প্রেমিক চেতন চৌধুরীর সঙ্গে মিলে কেতনকে হত্যার পরিকল্পনা করেন সিয়া—এমনটাই দাবি পুলিশের।

তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্তরা প্রথমে কেতনকে মারাত্মকভাবে জখম করার পরিকল্পনা করেছিল। এ জন্য মহারাষ্ট্রের বাইরে থেকে কাউকে ভাড়া করার সম্ভাবনাও তারা খতিয়ে দেখেছিল। তবে ভাড়াটে ব্যক্তি চক্রান্ত ফাঁস করে দিতে পারেন বা পরবর্তী সময়ে তাদের জন্য সমস্যা তৈরি করতে পারেন—এমন আশঙ্কায় সেই পরিকল্পনা বাদ দেওয়া হয়।

পুলিশ জানিয়েছে, ওই পরিকল্পনার সময় যে ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল, তিনি বর্তমানে মামলার একজন সাক্ষী।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, পরবর্তী সময়ে অভিযুক্তরা নিজেরাই কেতনকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সময় হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি বিভিন্ন সিনেমা দেখার পাশাপাশি চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ এবং পুলিশের হাত থেকে কীভাবে রেহাই পাওয়া যায়—এমন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন পডকাস্ট শোনে তারা।

এ ছাড়া মেঘালয়ের রাজা রঘুবংশী হত্যা মামলাটি সম্পর্কেও অভিযুক্তরা অনলাইনে একাধিকবার অনুসন্ধান চালিয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের দাবি, লোহাগড় দুর্গকে হত্যাকাণ্ডের স্থান হিসেবে চূড়ান্ত করার আগে লোনাভলার আশপাশের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখে অভিযুক্তরা। চার্জশিট অনুযায়ী, সিয়া গোয়েল ও চেতন চৌধুরি নির্জন স্থান খুঁজতে টাইগার পয়েন্টসহ বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছিল।

পুলিশ জানিয়েছে, গত বছরের মার্চে লোহাগড় দুর্গে দুর্ঘটনায় এক নারী মারা গিয়েছিলেন। কেতনের মৃত্যুকেও দুর্ঘটনা হিসেবে দেখানোর উদ্দেশ্যেই দুর্গটি বেছে নেওয়া হয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, ১৮ জুন কেতনকে হত্যার আগে ১৪ জুনও তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেদিন সিয়া কেতনকে পাহাড়ের চূড়া থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ পুলিশের।

তবে কেতন কোনোভাবে একটি গাছ আঁকড়ে ধরে বেঁচে যান। এরপর সিয়া ‘সাপ, সাপ’ বলে চিৎকার করে জানান, সাপ থেকে বাঁচাতেই তিনি কেতনকে সরিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

এর আগে ৪ জুনও সিয়া কেতনকে লোহাগড় দুর্গে যাওয়ার জন্য জোরাজুরি করেছিলেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ, অভিযুক্তরা বালিতে পরিকল্পিত ভ্রমণের আগেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটাতে চেয়েছিল বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

৬ জুন তাঁদের প্রি-ওয়েডিং ফটোশুটের জন্য বালি যাওয়ার কথা ছিল। তবে বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে সিয়া একটি ক্যাফের ওয়াশরুমে কেতনের পাসপোর্ট ছিঁড়ে ফেলেন বলে চার্জশিটে বলা হয়েছে। এতে তাঁদের বালির ভ্রমণ বাতিল হয়ে যায়।

কেতনকে লোহাগড় দুর্গে নিয়ে যাওয়ার জন্য সিয়া পরিচিত এক নারীর ছবি ব্যবহার করে ‘মাহি’ নামে একটি ভুয়া ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট তৈরি করেছিলেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই অ্যাকাউন্ট থেকে কেতনকে বার্তা পাঠিয়ে সিয়ার জন্মদিনে সারপ্রাইজ আয়োজনের অংশ হিসেবে ১৮ জুন লোহাগড় দুর্গে আসতে উৎসাহিত করা হয়। পুলিশের দাবি, কেতনকে দুর্গে ডেকে আনার জন্য রিতেশ হাঙ্গে তৈরি করা পরিকল্পনার অংশ ছিল এই ভুয়া অ্যাকাউন্ট। ঘটনার পরপরই অ্যাকাউন্টটি মুছে ফেলা হয়।

চার্জশিট অনুযায়ী, ১৮ জুন চেতন চৌধুরি একটি নির্দিষ্ট পথ দিয়ে লোহাগড় দুর্গে পৌঁছান। পরে সিয়ার কাছ থেকে সংকেত পেয়ে তিনি তাঁর সঙ্গে যোগ দেন।

কেতনের মনোযোগ অন্যদিকে থাকার সুযোগে সিয়া পেছন থেকে তাকে ধাক্কা দেন বলে অভিযোগ। এরপর চেতন চৌধুরি কেতনকে লাথি মারেন। এতে তিনি দুর্গ থেকে নিচে পড়ে যান বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশ জানিয়েছে, কেতনকে প্রথমে হাত-পা ভেঙে গুরুতর জখম করা এবং পরে হত্যা করার পরিকল্পনা সম্পর্কে চেতনের বন্ধু রিতেশ জানতেন। হত্যাকাণ্ডের পর চেতন রিতেশের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে বিষয়টি জানান বলেও চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, সিয়া প্রাথমিকভাবে কেতনকে সেলফি তুলতে গিয়ে অসাবধানতাবশত পড়ে গেছেন বলে জানান। প্রথম দিকে পুলিশও ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করে অপমৃত্যুর মামলা করে।

তবে কেতনের শেষকৃত্যের পর তাঁর বোন দুর্ঘটনার এই বর্ণনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন। বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে তাঁর সন্দেহের কথা জানান।

ঘটনার চার দিন পর সিয়া গোয়েল কেতনদের বাড়িতে সমবেদনা জানাতে গেলে কেতনের বোন লোহাগড় দুর্গে ঠিক কী ঘটেছিল সে বিষয়ে তাকে বিস্তারিত জিজ্ঞাসা করেন। চার্জশিট অনুযায়ী, সিয়ার উত্তরের অসংগতি এবং কিছু বিষয় এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা কেতনের বোনের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়।

পরে পরিবারের সদস্যরা পুলিশের কাছে গিয়ে নতুন করে তদন্তের দাবি জানান। প্রাথমিক তদন্তের পর গত ২৩ জুন পুলিশ সিয়া গোয়েল ও চেতন চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করে।

চার্জশিটে বলা হয়েছে, সিয়া ও চেতন গত তিন বছর ধরে প্রেমের সম্পর্কে ছিলেন। গত জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে তাঁদের মধ্যে দুই হাজারেরও বেশি বার কথা হয়েছে, যার মোট সময়কাল ছিল ২৩৮ ঘণ্টা।

মামলাটির পরবর্তী কার্যক্রম আদালতের মাধ্যমে চলবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *