খুলনা আঞ্চলিক সমাজ সেবা অধিদপ্তরে প্রকল্পের নামে কোটি টাকার দুর্নীতি, ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ

খুলনা বুরো:

সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন খুলনা আঞ্চলিক সমাজ সেবা অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পের আড়ালে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বরাদ্দকৃত সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি, ঘুষ বাণিজ্য এবং সাধারণ সেবাপ্রত্যাশীদের হয়রানির এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সাম্প্রতিক অনুসন্ধানে। স্থানীয় সূত্র, ভুক্তভোগীদের সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগপত্র বিশ্লেষণ করে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম পরিচালনা করে আসছে।

খুলনা অঞ্চলে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি যেমন ভিক্ষুক পুনর্বাসন, বিধবা ও বয়স্ক ভাতা, প্রতিবন্ধী সহায়তা, এতিমখানা পরিচালনা এবং ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভিক্ষুক পুনর্বাসন প্রকল্পে বরাদ্দকৃত সহায়তা বিতরণের ক্ষেত্রে নানা অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের নামে ভুয়া তালিকা তৈরি করে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ট্রাইসাইকেল, গবাদিপশু বা নগদ অর্থ প্রদানের কথা থাকলেও প্রকৃত সুবিধাভোগীরা তা পাচ্ছেন না। একাধিক ভুক্তভোগী জানান, তাদের নামে বরাদ্দ দেখানো হলেও বাস্তবে তারা কোনো অর্থ বা সহায়তা পাননি।

এছাড়া বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতা প্রাপ্তির ক্ষেত্রেও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ ব্যাপকভাবে শোনা যাচ্ছে। ভাতা কার্ড তৈরি বা নবায়নের জন্য সুবিধাভোগীদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ দেওয়ার পরও ভাতা চালু হয় না বা মাসের পর মাস ফাইল আটকে রাখা হয়। ফলে দরিদ্র ও অসহায় মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়ছেন।

এতিমখানা ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের নিবন্ধন এবং কমিটি অনুমোদনের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব সংগঠনের অনুমোদনের জন্য ১০ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হচ্ছে। খুলনা আঞ্চলিক অফিসে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট এসব কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

খুলনা আঞ্চলিক সমাজ সেবা অধিদপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা, বিশেষ করে সহকারী পরিচালক ও উপপরিচালক পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এদের মধ্যে কেউ কেউ পূর্বে অন্য জেলায় দুর্নীতির অভিযোগে বদলি হয়ে খুলনায় এসেও একই ধরনের অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছেন। সাতক্ষীরা জেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে কোটি টাকার দুর্নীতির তদন্ত চলমান রয়েছে, যার প্রভাব খুলনা অঞ্চলেও পড়েছে বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, কক্সবাজারের রামু থেকে দুর্নীতির অভিযোগে বদলি হয়ে খুলনায় যোগদান করা এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ঘুষ বাণিজ্য ও ভুয়া প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিযোগ রয়েছে। এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন পর্যায়ে জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) খুলনায় আয়োজিত এক গণশুনানিতে সমাজ সেবা অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরের বিরুদ্ধে মোট ১৭২টি অভিযোগ জমা পড়ে। এর মধ্যে ৫৯টি অভিযোগ দুদক আইনে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। কিছু অভিযোগ তাৎক্ষণিকভাবে নিষ্পত্তি করা হলেও বেশ কয়েকটি বিষয়ে অনুসন্ধানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া খুলনা অঞ্চলে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্পেও অনিয়মের অভিযোগে অনুসন্ধান চলছে।

ভুক্তভোগীরা জানান, “ভাতা পেতে গেলে ঘুষ না দিলে ফাইল এগোয় না। আমরা দরিদ্র মানুষ, কোথা থেকে এত টাকা দেব?” আরেকজন বলেন, “প্রকল্পের টাকা কাগজে দেখানো হলেও আমরা কিছুই পাই না। এতে আমাদের পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।” তাদের অভিযোগ, দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের কারণে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির সুফল প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।

এদিকে সমাজ সেবা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রশাসনের এই নীরবতা দুর্নীতিকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে বলেও মন্তব্য করেছেন অনেকে।

সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এ ধরনের দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতিই নয়, বরং সমাজের দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি একটি বড় ধরনের অবিচার। সরকারের বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।

সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায়, খুলনা আঞ্চলিক সমাজ সেবা অধিদপ্তরের এসব অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে দোষীদের চিহ্নিত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে এমন অনিয়ম বন্ধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এ ধরনের দুর্নীতি আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *