খুলনা খাদ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতির তোলপাড়: ডিসি ফুডের বিরুদ্ধে ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তর এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (ডিসি ফুড) কার্যালয়ে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়ম, ডিলার নিয়োগে ঘুষ গ্রহণ, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ঠিকাদারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগে খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. তানভীর হোসেনের নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে। এর পাশাপাশি আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়েও নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগী ডিলাররা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা এই অনিয়ম নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। তারা জানান, খুলনা মহানগরে খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থায় এই অনিয়মের ফলে সাধারণ মানুষ নির্ধারিত মূল্যে চাল-আটা পাচ্ছে না। কালোবাজারে চাল বিক্রি, ডিলারশিপ বাণিজ্য এবং ঠিকাদারি কাজে ঘুষের অভিযোগে খাদ্য অধিদপ্তরের সুনাম ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ডিসি ফুড তানভীর হোসেন খুলনায় যোগদানের মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে বিভিন্ন খাত থেকে প্রায় ১০ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে গুদাম ঠিকাদারদের কাছ থেকে ২ কোটি টাকা এবং অন্যান্য খাত থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা আরও জানিয়েছেন, ডিসি ফুড সহকারী খাদ্য পরিদর্শক নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস করেছেন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ঠিকাদারদের চুক্তি বাড়িয়ে দিয়ে লাখ লাখ টাকা হাতিয়েছেন। খুলনার মহেশ্বরপাশা গুদাম এবং অন্যান্য এলএসডি ডিপো থেকেও ঠিকাদারদের কাছ থেকে ৫০ লাখ টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

এই অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় ছাত্রনেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করার অভিযোগও উঠেছে। গত বছরের শেষ দিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীরা খুলনা মহানগরের বিভিন্ন ওএমএস পয়েন্টে মনিটরিং করে অনিয়মের প্রমাণ পেয়েছেন। তারা জানান, অনেক পয়েন্টে নির্ধারিত পরিমাণ চাল-আটা বিক্রি না করে কালোবাজারে বিক্রি করা হচ্ছে। কিছু ডিলার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এসব অনিয়মের পেছনে খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সহায়তার অভিযোগও এসেছে।

ছাত্রনেতা আসাদুল্লাহিল গালিব এবং আহসানুল হকসহ অনেকে এসব অনিয়মের বিরুদ্ধে মানববন্ধন এবং স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। ২০২৫ সালের আগস্টে খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক (আরসি ফুড) ইকবাল বাহার চৌধুরী এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক কাজী সাইফুদ্দীনকে একযোগে বদলি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধেও ওএমএস চাল-আটা বিতরণে অনিয়ম এবং মাসিক ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ ছিল। সূত্রমতে, ডিলারদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা তুলে ডিসি ফুডের জন্য রাখা হতো। এসব অভিযোগের ভিত্তিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় তাদের বদলি করেছিল।

খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য অধিদপ্তরের অধীনে ১০টি জেলা রয়েছে। এখানে খাদ্য সংরক্ষণ, বিতরণ এবং নিয়ন্ত্রণের কাজ পরিচালিত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো থেকে দেখা যায়, এই বিভাগে দুর্নীতির জাল বিস্তৃত। পূর্ববর্তী কর্মকর্তাদের সময়েও অনুরূপ অভিযোগ উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, খুলনার কেন্দ্রীয় খাদ্য গুদামের সাবেক সহকারী ব্যবস্থাপকের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে। এসব ঘটনা খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

ভুক্তভোগী ডিলাররা জানিয়েছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় ঘুষ ছাড়া ডিলারশিপ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। অনেকে লাখ লাখ টাকা দিলেও প্রতারিত হয়েছে। এছাড়া গুদাম থেকে চাল উত্তোলন এবং বিতরণে অনিয়মের কারণে সরকারি খাদ্যশস্য কালোবাজারে চলে যাচ্ছে। ফলে দরিদ্র মানুষ সঠিক মূল্যে খাদ্য পাচ্ছে না। খুলনা মহানগরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে ওএমএস কার্যক্রমে এই অনিয়ম সবচেয়ে বেশি দেখা গেছে।

খুলনার উপ-কমিশনার তৌফিকুর রহমান প্রক্রিয়াগত কিছু সমস্যা স্বীকার করেছেন। তবে তিনি বলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি। অভিযোগকারীরা খাদ্য মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি প্রদান করে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ডিসি ফুড তানভীর হোসেন সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছেন, তিনি শুধু অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছেন, যা পুরনো দুর্নীতির নেটওয়ার্ককে অসন্তুষ্ট করেছে।

স্থানীয় নাগরিক সমাজ এবং ছাত্র সংগঠনগুলো এই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর তদন্ত এবং দোষীদের শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তারা বলছে, খাদ্য অধিদপ্তরে দুর্নীতি নির্মূল না হলে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নিয়মিত মনিটরিং, ডিজিটালাইজেশন এবং স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে এই দুর্নীতি রোধ করা সম্ভব। খুলনাবাসী দ্রুত পদক্ষেপের অপেক্ষায় আছে, যাতে সরকারি খাদ্য বিতরণ ব্যবস্থা স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য হয় এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী নিরাপদে খাদ্য পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *