স্টাফ রিপোর্টার:
খুলনা জেলার খাদ্য গুদামগুলোতে (জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের অধীনে থাকা বিভিন্ন গুদামসহ) এক চাঞ্চল্যকর দুর্নীতির অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্র এবং অভ্যন্তরীণ তদন্তে জানা গেছে, সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণের জন্য নতুন পাটের বস্তা (জুট ব্যাগ) ক্রয়ের নাম করে আসলে পুরানো এবং নিম্নমানের বস্তা ব্যবহার করে বিল উত্তোলন করা হচ্ছে। এতে সরকারের কোষাগার থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর খাদ্য গুদামে ধান ও চাল মজুদের জন্য নতুন বস্তা ক্রয় করা বাধ্যতামূলক। নতুন বস্তাগুলোতে অবশ্যই নির্দিষ্ট মান থাকা প্রয়োজন—ওজন ধারণ ক্ষমতা ৫০ কেজি বা তার বেশি, উচ্চমানের পাটের তৈরি এবং সরকারি লোগোসহ। কিন্তু খুলনা জেলা খাদ্য গুদামের বেশ কয়েকটি কেন্দ্রে—বিশেষ করে খুলনা সদর, বটিয়াঘাটা ও দিঘলিয়া এলাকায়—নতুন বস্তার পরিবর্তে পুরানো বস্তা ব্যবহার করে বিল পাস করা হচ্ছে।
একাধিক অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, প্রতি বছর ধান-চাল সংগ্রহ মৌসুমে লক্ষ লক্ষ বস্তা প্রয়োজন হয়। নতুন বস্তার দাম প্রতি পিস ৫০-৭০ টাকা হলেও পুরানো বস্তা ১০-২০ টাকায় সংগ্রহ করে বিলে নতুনের দাম দেখানো হয়। এতে সরকারি কোষাগারে প্রতি বছর কয়েক কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয় ডিলার ও অভ্যন্তরীণ সূত্রের অভিযোগ, খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারের একটি সিন্ডিকেট এই দুর্নীতির মূল হোতা। তারা বস্তা সরবরাহকারী ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশ করে পুরানো বস্তা সরবরাহ করান এবং বিলে নতুন বস্তার দাম উল্লেখ করে অতিরিক্ত অর্থ উত্তোলন করেন।
খাদ্য গুদামে চাল-ধান ভর্তি করার সময়ও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নিয়মে প্রতি বস্তায় ৩০ কেজি ৩১৪ গ্রাম চাল গ্রহণের কথা থাকলেও বাস্তবে ২৯.৮০০ কেজি বা তার কম নেওয়া হয়। অতিরিক্ত অর্থ নগদে আদায় করা হয়। এছাড়া নিম্নমানের চাল গ্রহণ করে উচ্চমান দেখানোর প্রবণতাও রয়েছে।
খুলনা অঞ্চলে এই ধরনের অনিয়ম নতুন নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বটিয়াঘাটা, কয়রা ও সাতক্ষীরা সংলগ্ন এলাকায় একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। একটি ঘটনায় দেখা গেছে, পুরাতন মজুদ চালকে নতুন সংগ্রহ হিসেবে দেখিয়ে বিল তৈরি করা হয়েছে। এতে মিলার ও ঠিকাদারদের সঙ্গে যোগসাজশে কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। এছাড়া কাবিখা, জিআর ও টিআর প্রকল্পের চাল গুদাম থেকে না ছাড়িয়ে পুরাতন স্টক হিসেবে বিক্রি করা হয়েছে। নতুন সংগ্রহে ব্যবহৃত ক্যালেন্ডার বস্তাও বাইরে বিক্রি করে অতিরিক্ত আয় করা হয়েছে।
দুর্নীতির এই চক্রের ফলে সরকারি খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য বরাদ্দকৃত চাল-ধানের মান কমছে এবং গুদামে ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। স্থানীয় কৃষকরা বলছেন, সিন্ডিকেটের কারণে তারা নিম্নমানের ধান বিক্রি করলেও সঠিক মূল্য পাচ্ছেন না। অপরদিকে ওএমএস ডিলাররা ঘুষ দিয়ে বরাদ্দ পাচ্ছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে চালের দাম বাড়াচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং খাদ্য অধিদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কাছে এসব অভিযোগ পৌঁছেছে। কয়েকটি ক্ষেত্রে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে, কিন্তু এখনও কোনো ঠিকাদার বা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। স্থানীয় সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের দাবি, অবিলম্বে স্বচ্ছ তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি দিতে হবে। না হলে খাদ্য বিভাগের প্রতি জনগণের আস্থা আরও কমে যাবে।
খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “এ ধরনের অভিযোগ প্রতি বছর আসে, তদন্ত চলছে। দোষী প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
খুলনা অঞ্চলে খাদ্য গুদামগুলোতে দুর্নীতির এই চক্র দীর্ঘদিনের। ২০২৫ সালে বটিয়াঘাটা গুদামে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছিল, যেখানে নিম্নমানের চাল গ্রহণ ও অতিরিক্ত চাল সংগ্রহ দেখিয়ে কোটি টাকার আত্মসাৎ করা হয়েছিল। চুয়াডাঙ্গায় বস্তা কেনায় ১১ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলা হয়েছে দুদকে। খুলনায়ও এমন ঘটনা ঘটছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্নীতি শুধু অর্থ আত্মসাত নয়, বরং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তাকেও ঝুঁকিতে ফেলছে। সরকারের খাদ্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষকরা বলছেন, সঠিক মূল্য না পাওয়ায় তারা সমস্যায় পড়ছেন। অন্যদিকে বাজারে চালের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে।
দৈনিক স্বাধীন সংবাদ সূত্রে জানা গেছে, খাদ্য মন্ত্রণালয় ও দুদক অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের চিহ্নিত করতে পারে। গুদামগুলোতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নিয়মিত অডিট এবং ডিজিটাল ব্যবস্থাপনা চালু করলে দুর্নীতি অনেকাংশে রোধ করা সম্ভব। জনগণের ট্যাক্সের টাকা এভাবে লুটপাট হলে দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে।