মোঃ জাহাঙ্গীর হোসেন:
এক সময় শান্তি এবং কর্মচঞ্চলতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত খুলনা এখন ধীরে ধীরে এক আতঙ্কিত নগরীতে রূপ নিয়েছে। নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন নতুন নতুন হত্যাকাণ্ডের খবর মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রায় দুই-তিন দিনের ব্যবধানে হত্যাকাণ্ড ঘটছে, অথচ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর উপস্থিতি চোখে পড়ছে না।
নগরীর বিভিন্ন থানার এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, রাতের অন্ধকারে ছিনতাই, পূর্ব বিরোধের জেরে হত্যাকাণ্ড এবং মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব এখন যেন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, রাতে বের হওয়া তো দূরের কথা, দিনের বেলাতেও ভয় কাজ করছে। এক বাসিন্দা বলেন, “আমরা এখন আর নিরাপদ নই। দুই-তিন দিন পরপরই নতুন কোনো না কোনো খুনের খবর শুনতে হচ্ছে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খুলনায় আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ক্রমেই বেড়েছে। পুলিশের টহল কার্যক্রম কমে গেছে, অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার হচ্ছে না, এবং অপরাধ তদন্তে ধীরগতি প্রায় নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যাচ্ছে। এতে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবসায়ী বলেন, “খুনের ঘটনা ঘটার পর পুলিশ কিছুদিন নড়েচড়ে বসে, তারপর আবার সব আগের মতো হয়ে যায়। এতে অপরাধীরা কোনো ভয় পায় না।”
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, খুলনার বিভিন্ন এলাকায় মাদক ব্যবসা এবং সন্ত্রাসী চক্রের বিস্তার এই হত্যাকাণ্ড বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। কিছু প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে এসব চক্র গড়ে উঠেছে এবং তারা নির্বিঘ্নে অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা সরাসরি খুনসহ বড় অপরাধ বৃদ্ধির সঙ্গে সম্পর্কিত।
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বারবার হত্যাকাণ্ড ঘটলেও প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। অনেকেই মনে করছেন, প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়হীনতা এবং দায়িত্বে অবহেলা রয়েছে। একজন সচেতন নাগরিক বলেন, “এভাবে চলতে থাকলে খুলনা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। প্রশাসনকে এখনই কঠোর হতে হবে।”
প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকে একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গের গল্প। নিহতদের পরিবারগুলো ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও বিচার প্রক্রিয়া অনেক সময় দীর্ঘায়িত হয়। এক নিহতের স্বজন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমরা শুধু বিচার চাই। যারা আমার আপনজনকে হত্যা করেছে, তাদের শাস্তি হোক।”
বর্তমানে খুলনার অনেক এলাকায় সন্ধ্যার পর নেমে আসে এক ধরনের অজানা ভয়। ব্যবসায়ীরা আগেভাগেই দোকান বন্ধ করে দিচ্ছেন, সাধারণ মানুষ অপ্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের হচ্ছেন না। রাতের টহল কম, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে পর্যাপ্ত পুলিশ নেই, সিসিটিভি নজরদারি সীমিত, অপরাধপ্রবণ এলাকায় কার্যকর অভিযান নেই—এসব কারণে নাগরিক জীবন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
আইন-শৃঙ্খলা বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জরুরি পদক্ষেপ হিসেবে কয়েকটি পরামর্শ দিয়েছেন। নিয়মিত ও জোরদার পুলিশ টহল, সন্ত্রাসী ও মাদক চক্রের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান, দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করা, নগরজুড়ে সিসিটিভি স্থাপন বৃদ্ধি এবং কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার করা—এসব পদক্ষেপ নেওয়া হলে খুলনায় নাগরিক নিরাপত্তা কিছুটা নিশ্চিত করা সম্ভব।
উপসংহারে বলা যায়, খুলনা, যা একসময় শিল্প এবং শান্তির শহর হিসেবে পরিচিত ছিল, এখন ধীরে ধীরে অপরাধ ও আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে। সাধারণ মানুষের একটাই দাবি—নিরাপদ খুলনা এবং সন্ত্রাসমুক্ত সমাজ।