খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ঘুষ–দুর্নীতির সাম্রাজ্য: বদলি বাণিজ্যে কোটি টাকার লেনদেন

খুলনা প্রতিনিধি:

খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় বর্তমানে ভয়াবহ ঘুষ, দুর্নীতি ও অনিয়মের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। কার্যালয়ের বর্তমান আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে ওএমএস কার্যক্রম, চাল বরাদ্দ, ডিলার নিয়োগ ও বদলির নামে কোটি কোটি টাকার বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগ সামনে এসেছে। স্থানীয় ডিলার, খাদ্য পরিদর্শক এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অফিসটি এখন একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে খুলনায় যোগদানের পর থেকেই মামুনুর রশীদের নেতৃত্বে এই দুর্নীতির নেটওয়ার্ক বিস্তৃত হতে থাকে। খাদ্য অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ নথি ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি এর আগেও সিলেট আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতির অভিযোগে ২০২০ সালে চাকরি ছাড়তে বাধ্য হন। পরবর্তীতে রহস্যজনকভাবে ২০২৫ সালে তাকে আবার চট্টগ্রামে পদায়ন করা হয় এবং সেখান থেকে খুলনায় বদলি করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই পুনঃপদায়ন ও বদলির পেছনে রয়েছে শক্তিশালী একটি বদলি সিন্ডিকেট, যা অর্থের বিনিময়ে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে ঘুষ ছাড়া কোনো সরকারি কার্যক্রম সম্পন্ন হয় না। ওএমএস ডিলারদের মাসিক বরাদ্দ, অতিরিক্ত চাল প্রাপ্তি কিংবা তালিকায় টিকে থাকতে নিয়মিত বড় অঙ্কের ঘুষ দিতে হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ওএমএস ডিলার বলেন, “লাখ লাখ টাকা না দিলে বরাদ্দ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করা হয়।”

বদলি ও পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ভয়াবহ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক থেকে আঞ্চলিক বা পছন্দের কর্মস্থলে বদলির জন্য কয়েক লাখ থেকে শুরু করে কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। খাদ্য পরিদর্শকদের একাংশ জানান, টাকা না দিলে প্রত্যন্ত বা শাস্তিমূলক পোস্টিং দেওয়া হয়।

অভিযোগের তালিকায় আরও ভয়াবহ বিষয় যুক্ত হয়েছে—হাইকোর্টের আদেশ অমান্য করার অভিযোগ। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক হাইকোর্টের আদেশ প্রসঙ্গে প্রকাশ্যে অবজ্ঞাসূচক ভঙ্গিতে থাম্বস আপ দেখাচ্ছেন। সরকারি একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন আচরণ খুলনার সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

দুর্নীতির এই চক্র টিকিয়ে রাখতে কথিত কিছু ‘হাইব্রিড সাংবাদিক’কে অর্থের বিনিময়ে ম্যানেজ করার অভিযোগও উঠেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের একাংশ জানান, একাধিকবার অভিযোগ উঠলেও নির্দিষ্ট কয়েকজন সাংবাদিক মোটা অঙ্কের অর্থ ও সুবিধা নিয়ে সংবাদ প্রকাশ থেকে বিরত থাকেন। এতে প্রকৃত অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং জনগণ প্রকৃত তথ্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

এই দুর্নীতির প্রভাব সরাসরি পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা কর্মসূচিতে। দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার নির্ধারিত দামে চাল পাচ্ছে না, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে এবং সরকারের ভর্তুকি কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক খাদ্য পরিদর্শক বলেন, “আমরা অভিযোগ করেছি, কিন্তু ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে আমাদের হয়রানি করা হয়েছে।”

ইতোমধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও খাদ্য মন্ত্রণালয়ে একাধিক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, সুষ্ঠু তদন্ত হলে এই সিন্ডিকেটের পুরো চিত্র প্রকাশ পাবে।

মামুনুর রশীদের বিরুদ্ধে অভিযোগের মধ্যে রয়েছে—
▪ ওএমএস ডিলারদের কাছ থেকে নিয়মিত ঘুষ আদায়
▪ বদলি ও পদোন্নতির নামে কোটি টাকার বাণিজ্য
▪ খাদ্য বিতরণে অনিয়ম ও সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ
▪ হাইকোর্টের আদেশ অমান্য
▪ সাংবাদিকদের অর্থ দিয়ে প্রভাবিত করা

স্থানীয় জনগণ ও সচেতন মহল দ্রুত তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। খাদ্য নিরাপত্তা যেন কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আয়ের উৎসে পরিণত না হয়, সে জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মত দিয়েছেন তারা। দৈনিক স্বাধীন সংবাদ বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান অব্যাহত রাখবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *