খুলনার উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে সরকারি ভ্যাকসিনে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ, ক্ষুব্ধ খামারিরা

খুলনা বুরো:

খুলনার একটি সরকারি উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে সরকারি ভ্যাকসিনে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় খামারি, পশুপালক এবং সাধারণ পশুমালিকদের দাবি, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে ৫ থেকে ১০ টাকা বা তারও বেশি অতিরিক্ত টাকা আদায় করছেন কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি ভ্যাকসিন সরবরাহের নামে এ অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার মাধ্যমে তারা নিজেদের পকেট ভারী করছেন। এতে করে খামারি ও পশুপালকদের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং প্রাণিসম্পদের স্বাস্থ্য সুরক্ষাও ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, গবাদিপশু যেমন গরু, ছাগল ও ভেড়া এবং হাঁস-মুরগির বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধের জন্য সরকার নির্ধারিত দামে ভ্যাকসিন দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। রানীক্ষেত (এনডি), পিপিআর, গলাফুলা, খুরা রোগ, ডাকপ্লেক ও কলেরাসহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধী ভ্যাকসিনের জন্য নির্ধারিত দামের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তারা। সরকারি তালিকা অনুযায়ী এসব ভ্যাকসিন সাধারণত প্রতি ডোজ ১৫ থেকে ৫০ টাকার মধ্যে দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে ১৫ টাকার ভ্যাকসিন ২৫ থেকে ৩০ টাকায় এবং ৩০ টাকার ভ্যাকসিন ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বা তারও বেশি দামে দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক খামারি।

খামারিদের মতে, এভাবে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার ফলে তাদের মাসিক টিকাদান খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে যারা ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের খামার পরিচালনা করেন, তাদের জন্য এটি বড় ধরনের আর্থিক বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক খামারি অভিযোগ করেছেন, বাধ্য হয়ে তারা অতিরিক্ত টাকা দিয়েই ভ্যাকসিন নিতে বাধ্য হচ্ছেন, কারণ প্রাণিসম্পদের রোগ প্রতিরোধে এসব টিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগকারীরা আরও দাবি করেছেন, উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে মাসিক যে পরিমাণ ভ্যাকসিন বরাদ্দ আসে, তা সুষ্ঠুভাবে বিতরণ না করে কয়েকজন নির্দিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখে বিক্রি করেন। তারা বরাদ্দকৃত ভ্যাকসিনকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নিজেদের তত্ত্বাবধানে রাখেন এবং সুযোগ বুঝে তা বাড়তি দামে বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে সরকারি বিতরণ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

কিছু খামারি অভিযোগ করেছেন, অনেক সময় ভ্যাকসিন সংকটের কথা বলে তাদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা নেওয়া হয়। অথচ বাস্তবে পর্যাপ্ত বরাদ্দ থাকার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে সংকট তৈরি করে এ অনিয়ম চালানো হচ্ছে বলে তারা মনে করেন। ফলে খামারিদের একদিকে যেমন অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সময়মতো টিকা না পাওয়ার কারণে পশুপাখির রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।

খুলনা বিভাগে এ ধরনের অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও বিভিন্ন জেলায় সরকারি ভ্যাকসিন বিতরণ নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। ২০২২ সালে বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরে ভ্যাকসিন সংকটের অভিযোগ সামনে আসে। সে সময় খামারিরা অভিযোগ করেন, বিসিআরডিভি ও আরডিবি ভ্যাকসিনের চাহিদা মাসে ৫০০টির বেশি হলেও বরাদ্দ দেওয়া হতো মাত্র প্রায় ১০০টি। একইভাবে ডাকপ্লেক ও কলেরা ভ্যাকসিনের ক্ষেত্রেও চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ ছিল খুবই কম, ফলে খামারিদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছিল।

এছাড়া পিপিআর টিকা প্রকল্প নিয়েও দেশের বিভিন্ন এলাকায় অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যশোর, ঝিনাইদহসহ খুলনা বিভাগের কয়েকটি জেলায় খামারিরা অভিযোগ করেছেন, সরকারি প্রকল্পের আওতায় টিকা পাওয়ার কথা থাকলেও অনেক সময় তা পাওয়া যায় না। আবার কোথাও কোথাও অতিরিক্ত ফি নেওয়া বা ভুয়া হিসাব দেখিয়ে টিকা আত্মসাতের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত “ভ্যাকসিনসহ অন্যান্যের মূল্য নির্ধারণ-২০২৩” শীর্ষক পরিপত্রে স্পষ্টভাবে প্রতিটি ভ্যাকসিনের নির্ধারিত মূল্য, সেবা ফি এবং বিতরণ সংক্রান্ত নির্দেশনা উল্লেখ রয়েছে। এসব নির্দেশনার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের স্বচ্ছ ও নির্ধারিত মূল্যে ভ্যাকসিন প্রদান নিশ্চিত করা। পাশাপাশি বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরে অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থাপনা চালু রয়েছে, যেখানে অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ জানানো যায়।

তবে স্থানীয় খামারি ও পশুপালকদের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে এসব নিয়ম যথাযথভাবে মানা হচ্ছে না। তারা দাবি করেছেন, সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী ভ্যাকসিন বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব হবে না।

এ অবস্থায় স্থানীয় খামারি ও এলাকাবাসী দ্রুত তদন্ত করে দোষী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তারা সরকারি ভ্যাকসিন নির্ধারিত মূল্যে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিতরণ নিশ্চিত করা, ভ্যাকসিনের বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তর, জেলা প্রশাসন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। স্থানীয় সাংবাদিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাও বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। খামারিদের আশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিলে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে এবং প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *