খুলনার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক তানভীর হোসেনের দুর্নীতির অতীতের কালো ছায়া

স্টাফ রিপোর্টার: 

খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে চলমান ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) ডিলার নিয়োগে প্রশ্নপত্র ফাঁস, মাসিক প্রায় ১৬ লাখ টাকা ঘুষ আদায় এবং প্রায় ১০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই উঠে এসেছে তার বিরুদ্ধে পূর্ববর্তী কর্মস্থলগুলোতে সংঘটিত দুর্নীতি ও অনিয়মের একাধিক অভিযোগের বিস্তারিত ইতিহাস।

ভুক্তভোগী ডিলার ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, খুলনায় আলোচিত অনিয়মগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; বরং কিশোরগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কক্সবাজার ও বরগুনা—এই চারটি জেলায় দায়িত্ব পালনকালে তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে জমে উঠেছিল। তবে প্রতিবারই অভিযোগের পর শাস্তির বদলে তাকে বদলি করে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

বরগুনা থেকে খুলনায় বদলি, অভিযোগের ধারাবাহিকতা

সূত্র জানায়, তানভীর হোসেন সর্বশেষ বরগুনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে সম্প্রতি খুলনায় বদলি হয়ে আসেন। বরগুনায় তার কর্মকালীন সময়ে সরকারি ধান-চাল সংগ্রহে অনিয়ম, গুদাম ব্যবস্থাপনায় স্বেচ্ছাচারিতা এবং ডিলার নিয়োগে পক্ষপাতমূলক সিদ্ধান্তের অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়ভাবে একাধিকবার অভিযোগ উত্থাপিত হলেও সেগুলোর কোনো কার্যকর তদন্ত হয়নি।

এর আগে কক্সবাজারে কর্মরত অবস্থায় তার বিরুদ্ধে ঠিকাদারি কাজে ঘুষ গ্রহণ, খাদ্য পরিবহন ও গুদাম সংক্রান্ত বিলিংয়ে অতিরিক্ত অর্থ দাবি এবং সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কাছ থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগ ছিল। তবে এখানেও প্রশাসনিক কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

কিশোরগঞ্জে ওএমএস কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ

কিশোরগঞ্জ জেলায় দায়িত্ব পালনকালে তানভীর হোসেনের বিরুদ্ধে ওএমএস কার্যক্রমে ভর্তুকি চাল বিতরণে অস্বচ্ছতা এবং মিলারদের কাছ থেকে কমিশন আদায়ের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট মিলারদের সুবিধা দিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বরাদ্দ দেওয়া হতো এবং ডিলারদের একটি অংশকে বাদ দিয়ে সিন্ডিকেটভুক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়া হতো।

টাঙ্গাইলে অডিটে প্রায় ১১ কোটি টাকার আপত্তি

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠে আসে টাঙ্গাইল জেলায় তার কর্মকালকে ঘিরে। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি অডিটে প্রায় ১১ কোটি টাকার আর্থিক আপত্তি উত্থাপিত হয়। অডিট প্রতিবেদনে নিম্নমানের ধান সংগ্রহ, পরিবহন বিলে অতিরিক্ত দাবি, গুদাম ভাড়া ও ঠিকাদারি কাজে ব্যাপক অনিয়মের উল্লেখ ছিল।

অডিট সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এসব আপত্তির বড় একটি অংশই তানভীর হোসেনের দায়িত্বকালীন সময়ের। তবে এসব অভিযোগেও কোনো মামলা হয়নি বা কঠোর শাস্তি কার্যকর হয়নি। অভিযোগ নিষ্পত্তির পরিবর্তে তাকে অন্য জেলায় বদলি করা হয়।

খুলনায় নতুন করে অভিযোগের বিস্ফোরণ

খুলনায় যোগদানের মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই তানভীর হোসেন পুরনো সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে নতুন করে অনিয়ম শুরু করেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ওএমএস ডিলারদের। তারা জানান, ঠিকাদারি বিলিং রেট কৌশলে ২০ শতাংশ বাড়িয়ে তার মধ্যে থেকে ১০ শতাংশ কিকব্যাক আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি মিলারদের কাছ থেকে প্রতি টন গম বরাদ্দের বিপরীতে এক হাজার টাকা করে ঘুষ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবাদকারী ডিলারদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, লাইসেন্স বাতিলের হুমকি এবং প্রশাসনিক হয়রানির অভিযোগও তুলেছেন তারা।

অভিযোগ অস্বীকার, প্রশাসনের নীরবতা

তানভীর হোসেন তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন,
“আমি দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। তাই পুরনো দুর্নীতিবাজ চক্র উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে।”

খুলনার জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কিছু প্রক্রিয়াগত ত্রুটি থাকলেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের পক্ষে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

দুদকের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ ওঠার দুই মাস পেরিয়ে গেলেও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেনি কিংবা মামলা দায়ের করেনি। তানভীর হোসেন বর্তমানে বহাল তবিয়তেই দায়িত্ব পালন করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একাধিক জেলায় একই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া খাদ্য অধিদপ্তরের ভেতরে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি ও দায় এড়ানোর সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়। বারবার বদলির মাধ্যমে অভিযোগ চাপা দেওয়ার এই প্রবণতা খাদ্য নিরাপত্তা এবং সরকারি ভর্তুকি ব্যবস্থাকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে বলে তারা মনে করেন।

ভুক্তভোগী ডিলাররা দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্ত কর্মকর্তার সাময়িক বরখাস্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *