স্টাফ রিপোর্টার:
গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালন, ওএমএস (ওপেন মার্কেট সেল) কার্যক্রমে অনিয়ম, কথিত সিন্ডিকেট গড়ে তোলা, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া এক সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সচেতন মহল ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগকারীদের দাবি, খাদ্য পরিদর্শক সোহেল প্রায় ১২ বছর ধরে একই কার্যালয়ে কর্মরত রয়েছেন। দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের কারণে খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ওএমএস ডিলারদের সঙ্গে তার প্রভাবশালী যোগাযোগ গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার বিষয়টি, বদলিসংক্রান্ত বিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না এবং তার বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য অভিযোগের সত্যতা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।
দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে, বদলি নিয়ে প্রশ্ন
গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে খাদ্য পরিদর্শক হিসেবে সোহেলের দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের বিষয়টি সামনে এনে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ। তাদের দাবি, একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের ফলে সংশ্লিষ্ট এলাকায় কোনো কর্মকর্তা অতিরিক্ত প্রভাব বিস্তার করছেন কি না, তা প্রশাসনিকভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন সংশ্লিষ্ট বিধি, প্রশাসনিক প্রয়োজন এবং কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরিচালিত হয়। সে ক্ষেত্রে খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের কর্মস্থলে যোগদানের তারিখ, চাকরির পদায়নসংক্রান্ত নথি এবং দীর্ঘদিন একই কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনের প্রশাসনিক কারণ খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন কর্মকর্তার দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার ক্ষেত্রে কোনো বিশেষ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত রয়েছে কি না, থাকলে তার ভিত্তি কী এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করেছে কি না। এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই জরুরি।
সম্পদ অর্জন নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আলোচনা
অভিযোগে বলা হয়েছে, খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের গ্রামের বাড়ি গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার মাস্টারবাড়ি এলাকায়। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, চাকরিতে যোগদানের পর থেকে তার আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটেছে। পাশাপাশি শ্রীপুর ও মাস্টারবাড়ি এলাকায় তার নামে বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে জমি ও অন্যান্য সম্পদ রয়েছে বলেও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
তবে এসব সম্পদের প্রকৃত মালিকানা, পরিমাণ, ক্রয়ের সময় এবং অর্থের উৎস সম্পর্কে কোনো যাচাইকৃত নথি এই প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়নি। ফলে অভিযোগের ভিত্তিতে সম্পদের পরিমাণ বা অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।
সচেতন নাগরিকদের দাবি, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার আয়কর বিবরণী, সম্পদসংক্রান্ত ঘোষণাপত্র, জমি ও স্থাবর সম্পত্তির নিবন্ধন এবং আয়-ব্যয়ের সামঞ্জস্য পরীক্ষা করা যেতে পারে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি অনুসন্ধানের দাবিও জানিয়েছেন তারা।
তাদের মতে, সরকারি দায়িত্বে থাকা কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আয়ের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠলে তা গুজব বা অনুমানের ভিত্তিতে নিষ্পত্তি না করে প্রমাণ ও নথির ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ওএমএস কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ
সরকারের ওএমএস কর্মসূচির উদ্দেশ্য হলো সাধারণ মানুষের কাছে নির্ধারিত মূল্যে চাল ও আটা পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তি সহজ করা এবং বাজারদরের চাপ মোকাবিলায় এ কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এ কার্যক্রমে কোনো ধরনের অনিয়ম হলে তার প্রভাব সরাসরি সাধারণ ভোক্তাদের ওপর পড়তে পারে।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের সুবাদে খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের সঙ্গে খাদ্য বিভাগের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং ডিলারদের একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে। এই বলয়ের মাধ্যমে ওএমএসের চাল ও আটা বিতরণে অনিয়ম সংঘটিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ওএমএসের পণ্য বিতরণ, ডিলারদের কার্যক্রম তদারকি, বরাদ্দের সঠিক ব্যবহার এবং উপকারভোগীদের কাছে পণ্য পৌঁছানোর বিষয়গুলো যথাযথভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। কর্মসূচির পণ্য নির্ধারিত নিয়মে বিতরণ হচ্ছে কি না, বরাদ্দের সঙ্গে প্রকৃত বিতরণের হিসাব মিলছে কি না এবং কোনো ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে সরকারি অর্থের ক্ষতি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে কথিত সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব, অনিয়মের ধরন, আর্থিক লেনদেন কিংবা সরকারি পণ্য আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি, নিরীক্ষা প্রতিবেদন বা তদন্তের ফলাফল পাওয়া যায়নি। তাই এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে খাদ্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট ডিলার ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য নেওয়া জরুরি।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, ওএমএস কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বরাদ্দ, মজুত, বিক্রয় ও বিতরণের হিসাব নিয়মিত নিরীক্ষা করা উচিত। একই সঙ্গে অভিযোগ পাওয়া গেলে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিক লাঞ্ছিতের অভিযোগ
খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুতর হলো তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া এক সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করা, তার মোবাইল ফোন নিয়ে নেওয়া এবং একটি কক্ষে আটকে রাখার চেষ্টার অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, সম্প্রতি ওএমএস কার্যক্রমে কথিত অনিয়ম এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বক্তব্য নিতে ওই সাংবাদিক গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে যান। সেখানে তথ্য জানতে চাইলে খাদ্য পরিদর্শক সোহেল ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, একপর্যায়ে সোহেল ওই সাংবাদিকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং তার পকেটে থাকা ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন ও সঙ্গে থাকা একটি আইফোন জোরপূর্বক নিয়ে নেন। এরপর তাকে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের একটি কক্ষে আটকে রাখার চেষ্টা করা হয় বলেও অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া সোহেল নিজের মুঠোফোন দিয়ে ওই সাংবাদিকের ভিডিও ধারণ করেন এবং তাকে মানসিকভাবে হেনস্তা করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি যেভাবে বর্ণনা করা হয়েছে, তা সত্য হলে সাংবাদিকের নিরাপত্তা, ব্যক্তিগত সম্পত্তি এবং পেশাগত দায়িত্ব পালনের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
তবে ঘটনার সময় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্য, কার্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ, সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোনের অবস্থা এবং কোনো লিখিত অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে কি না—এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযুক্ত কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্যও এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সরকারি কার্যালয়ে নাগরিকের সঙ্গে আচরণ নিয়ে প্রশ্ন
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জনগণের সেবায় নিয়োজিত। তাঁদের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে পেশাদার আচরণ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং নাগরিকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সরকারি কর্মসূচি ও জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে তথ্য জানতে গেলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের নিয়ম অনুযায়ী সহযোগিতা করা প্রত্যাশিত।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের অভিযোগ, খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত ঘটনাগুলো যথাযথভাবে তদন্ত না হলে সরকারি দপ্তরের জবাবদিহি নিয়ে জনমনে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাঁদের মতে, কোনো সাংবাদিক তথ্য সংগ্রহ করতে গেলে তাঁর সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ বা শারীরিকভাবে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠলে সেটিকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগে কোনো ব্যক্তিকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রমাণ পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করাই হবে দায়িত্বশীল পদক্ষেপ।
নিরপেক্ষ তদন্ত ও প্রশাসনিক পদক্ষেপের দাবি
খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী ও সচেতন নাগরিকদের একটি অংশ। তাঁদের দাবি, প্রথমে তাঁর চাকরির পদায়ন ও কর্মস্থলে থাকার সময়কাল যাচাই করতে হবে। পাশাপাশি ওএমএসের বরাদ্দ, বিতরণ, মজুত ও বিক্রির নথি পরীক্ষা করে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং সাংবাদিককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগের বিষয়ে পৃথকভাবে তদন্তের দাবি উঠেছে। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
অভিযোগকারীদের মতে, সরকারি খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি নিয়ে কোনো অনিয়ম থাকলে তার দায় নির্ধারণ করা যেমন জরুরি, তেমনি সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনের সময় কোনো ধরনের হয়রানি বা বাধার ঘটনা ঘটেছে কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ
এ বিষয়ে গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য, খাদ্য পরিদর্শক সোহেলের প্রতিক্রিয়া এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথিপত্র যাচাই করে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা উচিত।
সব মিলিয়ে, একই কর্মস্থলে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন, ওএমএস কার্যক্রমে কথিত অনিয়ম, সম্পদ অর্জন এবং সাংবাদিক লাঞ্ছনার অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। অভিযোগগুলো সত্য হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযোগের ভিত্তি না পাওয়া গেলে প্রকৃত তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। এতে সরকারি খাদ্য বিতরণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ সুগম হবে।