গুপ্তদের ভেতরে স্বৈরাচার লুকিয়ে আছে কি না, প্রশ্ন প্রধানমন্ত্রীর

নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রশ্ন তুলেছেন, স্বৈরাচারের সময় যারা গুপ্তবেশে লুকিয়ে ছিল, তারা এখন অরাজকতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে কি না। তিনি বলেন, স্বৈরাচারের সময় একটি রাজনৈতিক দল গুপ্তবেশ ধারণ করে স্বৈরাচারের ভেতরে লুকিয়ে ছিল। পরবর্তীতে তাদের নিজেদের লোকজনই বেরিয়ে এসে বিষয়টি স্বীকার করেছে।শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) মিলনায়তনে বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় এসব কথা বলেন তিনি। ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগানে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।সভায় তারেক রহমান বলেন, বর্তমানে বেশ কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি ছড়িয়ে দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। এই বিভ্রান্তির সুযোগ নিয়ে স্বৈরাচারী শক্তি আবারও অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।তিনি বলেন, ‘আমরা খেয়াল করছি, বেশ কিছু রাজনৈতিক দল বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে। বিভ্রান্তির মাধ্যমে দেশে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা করছে। আমি পরিষ্কারভাবে বলতে চাই, বাংলাদেশের জনগণ এই সরকারকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।’তারেক রহমান বলেন, বিএনপি গণতন্ত্রের ধারা সমুন্নত রাখবে এবং গণতান্ত্রিক নীতি-নৈতিকতা সর্বোচ্চভাবে অনুসরণ করবে। তবে কেউ অরাজকতা সৃষ্টি করতে চাইলে দেশের আইনে তা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা রয়েছে।‘সরকার হিসেবে এবং শুধু সরকার হিসেবে নয়, জনগণের দ্বারা নির্বাচিত সরকার হিসেবে পরিষ্কারভাবে বলতে চাই—প্রত্যেকের প্রত্যেকের সীমার মধ্যে থাকা দরকার,’ বলেন তিনি।গুপ্তদের প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, যারা গুপ্ত তারা যদি সেই স্বৈরাচারকেই আবার সামনে নিয়ে আসার কাজ করে, তাহলে বিষয়টি জনগণের সামনে পরিষ্কার করতে হবে। তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে গুপ্তদের একজন নেতা বলেছেন, ‘তাদের এতে আপত্তি নেই।’ তাহলে দেখা যাচ্ছে, একজন আরেকজনকে বিভিন্নভাবে গুপ্ত রাখার চেষ্টা করছে।জাতীয়তাবাদী শক্তির নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, জনগণকে আরও সচেতন করতে হবে। কে কাকে গুপ্ত করার দায়িত্ব নিচ্ছে, সেটি জনগণের সামনে উন্মুক্ত করে দিতে হবে।তিনি দাবি করেন, ১৯৭১ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ‘গুপ্ত বাহিনী’ একে অন্যকে আড়াল ও আশ্রয় দিয়ে এসেছে। ১৯৭১, ১৯৮৬, ১৯৯৬ সাল, গত এক যুগ এবং বর্তমান সময়েও তারা বিভিন্নভাবে একে অন্যকে আড়াল করে চলেছে বলে দাবি করেন তিনি। তাদের এই রাজনীতি জনগণের সামনে তুলে ধরার আহ্বান জানান বিএনপি চেয়ারম্যান।দেশের বর্তমান জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকটের প্রসঙ্গ তুলে তারেক রহমান বলেন, জ্বালানির কারণে দেশের মানুষ কষ্টে আছে—এটি সরকার অস্বীকার করছে না। এ জন্য দল ও সরকারের পক্ষ থেকে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চান তিনি।তিনি বলেন, বিগত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দেশ কীভাবে পরিচালিত হয়েছে, দেশের মানুষের গণতান্ত্রিক ও কথা বলার অধিকার কীভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে এবং দেশকে কীভাবে আমদানিনির্ভর করে দেওয়া হয়েছে, তা দেশের মানুষ দেখেছে।তারেক রহমান বলেন, ‘সেজন্যই বিগত নির্বাচনে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সিদ্ধান্ত নিয়ে বিএনপিকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে।’তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে দেশের বিভিন্ন সংকটকালীন মুহূর্তে জনগণ বিএনপিকে দায়িত্ব দিয়েছে। দলটি নেতৃত্ব ও নেতাকর্মীদের নিয়ে জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সংকট থেকে দেশকে বের করে আনতে কাজ করেছে।সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই একটি যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হয়েছে। এর পাশাপাশি ভঙ্গুর স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ বহুবিধ সমস্যা উত্তরাধিকারসূত্রে পেয়েছে সরকার।তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে জ্বালানি সংকট। বহু মানুষ বিদ্যুৎ ও জ্বালানির কষ্টে আছেন। বিএনপি জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকার হিসেবে এ সমস্যা সমাধানে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।’কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সময় প্রয়োজন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে বিশ্বে আবারও বিভিন্ন ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। তখন যেন বাংলাদেশের মানুষ জ্বালানি সংকটে না পড়ে, সেভাবেই বিএনপি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে।বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটে থাকা সাধারণ মানুষ এবং শিল্পকারখানার মালিকদের কাছেও দলের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করেন তিনি।তারেক রহমান বলেন, বিএনপি প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দেশকে গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালনা এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার সমুন্নত রাখার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করেছে। গণতন্ত্রের জন্য দলের বহু নেতাকর্মী জীবন উৎসর্গ করেছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।তিনি বলেন, বিএনপি একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এমন একটি গণতন্ত্র চায়, যেখানে রাজনৈতিক দলের মানুষ কিংবা সাধারণ নিরপেক্ষ মানুষ—প্রত্যেকে নিজের বক্তব্য তুলে ধরতে পারবেন এবং কাউকে বক্তব্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হবে না।তিনি বলেন, স্বৈরাচারী সরকার কিংবা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া—যে সমস্যাই হোক, সরকার সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করছে। সরকার কখনো বলেনি যে দেশে কোনো সমস্যা নেই। বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমস্যা রয়েছে এবং সরকার সেগুলো সমাধানে কাজ করছে।বিএনপির নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ছয় মাস আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জনগণের সামনে বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নারীদের স্বাবলম্বী করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষকদের স্বাবলম্বী করতে কৃষক কার্ড দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল।এ ছাড়া ইমাম, খতিব, মুয়াজ্জেমসহ বিভিন্ন ধর্মীয় গুরুদের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সম্মানজনক ব্যবস্থা করা, শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং গ্রামের মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জনগণকে জানানো হয়েছিল।তিনি দাবি করেন, নির্বাচনের সময় দেওয়া এসব প্রতিশ্রুতির প্রতিটি বাস্তবায়নের কাজ শুরু হয়েছে।তারেক রহমান বলেন, বিধ্বস্ত অর্থনীতির মধ্যে একটি যুদ্ধ সামাল দিয়ে সরকার দেশকে এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। একই সঙ্গে জনগণের ওপর যাতে যতটা সম্ভব কম চাপ পড়ে, সেদিকেও নজর রাখা হচ্ছে।মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপসহ বিশ্বের প্রায় ৬৫টি দেশে জ্বালানির দাম বেড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার দীর্ঘদিন জ্বালানির দাম না বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে। শেষ পর্যন্ত সম্ভব না হওয়ায় বাধ্য হয়ে কিছুটা দাম বাড়ানো হয়েছে।সাম্প্রতিক বাজেটের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষের ওপর চাপ কমাতে প্রায় ৬০টি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর কর বাড়ানো হয়নি। বরং এসব পণ্যের মধ্যে বেশ কিছু পণ্যের ওপর কর আরও কমানো হয়েছে।বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি জনগণের সামনে সুনির্দিষ্ট ও বাস্তবভিত্তিক ম্যানিফেস্টো উপস্থাপন করেছে। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল সেভাবে ম্যানিফেস্টো উপস্থাপন করেনি বলেও দাবি করেন তিনি।তার ভাষ্য, বিএনপিই জনগণের সামনে কংক্রিট পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছে। দেশের প্রতিটি সংকটকালীন অবস্থায় বিএনপি পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করেছে। এর সুফল শেষ পর্যন্ত জনগণই ভোগ করেছে।বিএনপির নেতাকর্মীদের দেশ গঠনে সরাসরি ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আগামী পাঁচ বছরে পরিবেশ রক্ষায় সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ করতে চায়।তিনি বলেন, বিএনপির লাখ লাখ নেতাকর্মী যদি প্রত্যেকে প্রতিবছর পাঁচটি করে গাছের চারা রোপণ করেন, তাহলে শহীদ জিয়াউর রহমানের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, খালেদা জিয়ার বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং সরকারের ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে বড় ধরনের সহযোগিতা করা সম্ভব হবে।শহীদ জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার সেই কর্মসূচি আবার চালু করেছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনা রয়েছে।বিএনপির নেতাকর্মীদের নিজ নিজ এলাকায় খাল খনন কর্মসূচিতে গর্ব ও দায়িত্ববোধ নিয়ে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।বাংলাদেশকে পরিচ্ছন্ন ও সুন্দর দেশ হিসেবে গড়ে তুলতে দলীয় নেতাকর্মীদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তারেক রহমান।তিনি বলেন, ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, তাঁতী দল, আইনজীবী দল, মৎস্যজীবী দলসহ বিএনপির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠন রয়েছে। দেশের গ্রাম, ইউনিয়ন, ওয়ার্ড, উপজেলা ও পৌরসভায় দলের কমিটিও রয়েছে।এসব সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে যেখানে ময়লা-আবর্জনা রয়েছে, সেখানে জনগণকে উৎসাহিত করে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব বলে মন্তব্য করেন তিনি।তিনি বলেন, দলের নাম ব্যবহার করে এমন কোনো কাজ করা যাবে না, যা সাধারণ মানুষের কষ্টের কারণ হয়। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এটিকে দলের নেতাকর্মীদের প্রতিজ্ঞা হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।স্বৈরাচারের সময়ে বিএনপির প্রায় ৫০ লাখ নেতাকর্মীর নামে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা ছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, দলের বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীর মধ্যে কেউ হয়তো কোথাও এমন কিছু করে থাকতে পারেন, যা দল ও দেশকে বিব্রত করেছে।তিনি আরও বলেন, সবাইকে এমপি বা মন্ত্রী করা সম্ভব নয়। অধিকাংশ দলের অধিকাংশ নেতাকর্মী দীর্ঘ সময় কর্মী হিসেবেই থাকেন। তবে যারা সত্যিকার অর্থে শহীদ জিয়াউর রহমানকে নেতা এবং খালেদা জিয়াকে ‘মা’ হিসেবে মানেন, তাদের দেশ ও দল গঠনের কাজে নিজেদের সম্পৃক্ত করতে হবে।বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান তারেক রহমান।তিনি বলেন, খালেদা জিয়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি ঘরে বিএনপির বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। দলের প্রতিষ্ঠা থেকে আজ পর্যন্ত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্ন সময়ে যারা আহত ও শহীদ হয়েছেন, তাদেরও স্মরণ করেন তিনি।শহীদ নেতাকর্মীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহত ও বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মান জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শেষে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ।’

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *