চট্টগ্রাম ডুবছে বন্যায়, কিন্তু মানুষের বিবেক কি জেগে উঠবে?

চট্টগ্রাম, হাটহাজারী, রাউজান, ফটিকছড়ি, রাঙ্গুনিয়া, মীরসরাইসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ জনপদ আজ বন্যার পানিতে বিপর্যস্ত। হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়েছে। অনেকেই আশ্রয়কেন্দ্রে কিংবা উঁচু স্থানে অনিশ্চিত জীবন কাটাচ্ছেন। শিশুদের জন্য দুধ নেই, অসুস্থদের জন্য ওষুধ নেই, অনেক পরিবার বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে। কোথাও কোথাও ত্রাণ পৌঁছালেও বহু মানুষের অভিযোগ—সেটি প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত অপ্রতুল।

দুর্যোগের সময় মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা হলো মানবতা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এখন অনেক মানুষের মধ্যেই এক ধরনের অনাস্থা কাজ করছে। অতীতের ত্রাণ কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন সময়ে যে প্রশ্ন, বিতর্ক ও অভিযোগ উঠেছিল এবং যেসব বিষয়ে জনগণের সামনে পূর্ণাঙ্গ ও গ্রহণযোগ্য জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তার প্রভাব আজও রয়ে গেছে। ফলে অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা করতে চাইলেও কোনো তহবিলে অর্থ দিতে দ্বিধায় ভুগছেন। কেউ কেউ সরাসরি দুর্গত মানুষের হাতে সহায়তা পৌঁছে দিতে আগ্রহী, কারণ তারা চান তাদের অনুদান সঠিক মানুষের কাছে পৌঁছাক।

আমি নিজেও অতীতে বন্যার্ত মানুষের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী অনুদান দিয়েছিলাম। একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা ছিল, প্রতিটি টাকা অসহায় মানুষের কল্যাণে ব্যয় হবে। তাই আজও আমার প্রশ্ন—দুর্যোগে সংগৃহীত অনুদানের পূর্ণাঙ্গ, নিরীক্ষিত ও জনসম্মুখে প্রকাশিত হিসাব কি যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে? জনগণের এই প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া তাদের ন্যায্য অধিকার।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের জন্মস্থান চট্টগ্রামের হাটহাজারী। আজ সেই এলাকাও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত। তাই একজন নাগরিক হিসেবে আমার প্রত্যাশা, তিনি এবং সংশ্লিষ্ট সব দায়িত্বশীল ব্যক্তি, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, রাজনৈতিক দল, ব্যবসায়ী ও সমাজের বিত্তবান মানুষ দল-মত নির্বিশেষে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়াবেন। এই মুহূর্তে মানুষের পরিচয় হওয়া উচিত মানবতা, দায়িত্ব ও জবাবদিহি।

বন্যার পানি একদিন নেমে যাবে, কিন্তু মানুষের আস্থা যদি হারিয়ে যায়, তা ফিরিয়ে আনতে অনেক সময় লাগে। তাই শুধু ত্রাণ বিতরণ করলেই হবে না; কোথা থেকে কত অর্থ এসেছে, কীভাবে ব্যয় হয়েছে এবং কারা সহায়তা পেয়েছেন—এসব তথ্য নিয়মিত ও স্বচ্ছভাবে জনগণের সামনে প্রকাশ করতে হবে। স্বচ্ছতাই মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনার একমাত্র পথ।

আজ চট্টগ্রামের মানুষ রাজনীতি নয়, বেঁচে থাকার লড়াই লড়ছে। তারা অপেক্ষা করছে একবেলা খাবারের, এক বোতল বিশুদ্ধ পানির, একটি ওষুধের প্যাকেটের এবং নিরাপদ আশ্রয়ের। এই সংকটে আমাদের সবার দায়িত্ব—যতটা সম্ভব দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং একই সঙ্গে ত্রাণ কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানানো।

মানুষের অনুদান মানুষের কাছেই পৌঁছাক—এই প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড় দাবি।

— এ এম এম আহসান ✍️

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *