চট্টগ্রামের আতঙ্ক ‘রায়হান’ অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক হত্যাকাণ্ড, অস্ত্রের মহড়া, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী রায়হান অবশেষে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে অস্ত্রসহ গ্রেপ্তার হয়েছেন। তার গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে নগরজুড়ে স্বস্তি ফিরে এলেও অতীতের একাধিক আলোচিত অপরাধের তদন্ত ও বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

পুলিশের তথ্যমতে, গ্রেপ্তার হওয়া রায়হান (৩৫) চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার দক্ষিণ-পূর্ব রাউজান ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের জুরুরকূল মুন্দার খলিফার বাড়ির বদিউল আলমের ছেলে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্র, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজিসহ অন্তত ১৩টি মামলা রয়েছে। এসব মামলার মধ্যে বাকলিয়ার জোড়া খুন, বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় সরওয়ার হত্যা, পতেঙ্গায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা, রাউজানে মাকসুদ হত্যা এবং ইব্রাহিম হত্যা অন্যতম।

স্থানীয় সূত্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, রায়হানকে দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামের অন্যতম ভয়ংকর অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে বিবেচনা করা হতো। অভিযোগ রয়েছে, সামান্য বিরোধেও তিনি আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতেন এবং প্রতিপক্ষকে গুলি করতে দ্বিধা করতেন না। তার নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী চক্র নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে আসছিল।

পুলিশের অভিযানে বারবার ফসকে যাওয়া

জানা যায়, গত বছরের ২১ এপ্রিল রাতে রায়হানকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশ্যে রাউজানে বিশেষ অভিযান চালায় নগর পুলিশের একটি দল। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তার অবস্থানের খুব কাছাকাছি পৌঁছেও তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি পালিয়ে যান।

অভিযানের পরদিন যে যুবক পুলিশকে তথ্য দিয়েছিলেন, তাকে নিজ বাড়ির সামনে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। নিহত ইব্রাহিম (২৬) রাউজান উপজেলার শমসের নগর আদর্শ গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। ওই হত্যাকাণ্ডের পর রায়হানের বিরুদ্ধে পুলিশের সোর্স হত্যার অভিযোগ আরও জোরালো হয় এবং এরপর দীর্ঘ সময় তাকে ধরতে কার্যকর অভিযান দেখা যায়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

ইব্রাহিম হত্যা মামলার ভয়াবহ বর্ণনা

ইব্রাহিম হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল দুপুরে আবুল মার্কেটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় তিনটি সিএনজি অটোরিকশায় করে রায়হান ও তার সহযোগীরা ঘটনাস্থলে আসে। তারা প্রথমে ইব্রাহিমকে মারধর করে এবং পরে কাছ থেকে একাধিক গুলি চালায়। মাথা, পিঠ, কোমর, নাভির নিচে ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় রায়হানসহ আটজনকে আসামি করা হলেও অধিকাংশ আসামি দীর্ঘদিন ধরেই ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন।

একের পর এক আলোচিত হত্যা

পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রায়হানের বিরুদ্ধে হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে একাধিক মামলা দায়ের হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

  • বাকলিয়ায় জোড়া খুন,
  • বায়েজিদে সরওয়ার হত্যা,
  • পতেঙ্গায় ঢাকাইয়া আকবর হত্যা,
  • রাউজানে মাকসুদ হত্যা,
  • ইব্রাহিম হত্যা।

এসব ঘটনায় তাকে প্রধান পরিকল্পনাকারী কিংবা সরাসরি অংশগ্রহণকারী হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

ডেভিড ইমন গ্রেপ্তারের সময়ও পালিয়ে যান

চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাসুদ আলম পূর্বে জানিয়েছিলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তারের সময় একই সঙ্গে নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জে রায়হানকে ধরতেও অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি একটি ভবনের ছাদ থেকে লাফ দিয়ে পালিয়ে যান। যদিও ওই অভিযানের পর তার সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ে বলে দাবি পুলিশের।

ছোট সাজ্জাদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বিদেশে অবস্থানরত কুখ্যাত সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীর সহযোগী হিসেবে রায়হান দীর্ঘদিন ধরে অপরাধ কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছিলেন। কারাগারে থাকাকালীন ছোট সাজ্জাদের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। পরে জামিনে মুক্ত হয়ে তারা একসঙ্গে অপরাধচক্র পরিচালনা শুরু করেন।

পুলিশের দাবি, ছোট সাজ্জাদ পুনরায় কারাগারে যাওয়ার পর তার অস্ত্রভাণ্ডার ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন রায়হান।

ভারী অস্ত্র সংগ্রহের অভিযোগ

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি সূত্রের দাবি, সম্প্রতি রায়হান বিপুল অর্থ ব্যয়ে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি কিনেছিলেন এবং পাহাড়ি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছ থেকে ভারী অস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন। এসব অস্ত্র ব্যবহার করে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের পরিকল্পনা ছিল বলেও তদন্তকারীদের ধারণা।

পতেঙ্গার আলোচিত আকবর হত্যা

গত ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ঢাকাইয়া আকবর ওরফে আকবর আলীকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার ঘটনায়ও রায়হানকে আসামি করা হয়েছে। আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়ার পর আকবর নিজেই হামলাকারী হিসেবে রায়হানের নাম উল্লেখ করেছিলেন বলে মামলার তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে অপরাধচক্র

রায়হান গ্রেপ্তারের পর তার কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্র, সহযোগীদের পরিচয়, অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং তার নেতৃত্বাধীন সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহে কাজ করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। তদন্তকারীদের আশা, তার জিজ্ঞাসাবাদে চট্টগ্রামের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসবে।

পুলিশ জানিয়েছে, রায়হানের বিরুদ্ধে থাকা সব মামলার তদন্ত দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে এবং তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *