স্টাফ রিপোর্টার:
বরিশাল নগরীতে চাঁদাবাজি, রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, করোনা মহামারির সময় সরকারি সহায়তা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাৎ এবং ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন ঘিরে সহিংসতার অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন আওয়ামী লীগের বরিশাল মহানগরীর ১০ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সাধারণ সম্পাদক শেখর চন্দ্র দাস। তাঁর বিরুদ্ধে নগরীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক এলাকা, ফুটপাতের হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় ‘হোটেল সি-গাল’ নামে পাঁচতলা একটি আবাসিক হোটেল নির্মাণ এবং সেখানে তাঁর ও পরিবারের মালিকানা থাকার দাবি সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, বরিশালে বিভিন্ন সময় প্রভাব খাটিয়ে অর্থ আদায়ের মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ওই হোটেল নির্মাণে ব্যয় করা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই, হোটেলটির মালিকানাসংক্রান্ত নথি এবং সম্পদ অর্জনের অর্থের উৎস সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বরিশাল নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নিজের প্রভাববলয় গড়ে তোলেন শেখর চন্দ্র দাস। নগরীর মহসিন মার্কেট, স্টিমারঘাট, কাঁচাবাজার ও বাটার খাল এলাকাসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থানে তাঁর বিরুদ্ধে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি ছোট দোকান ও পানির দোকানের ব্যবসায়ীদেরও চাঁদা দিতে হতো বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে দোকান ভাঙচুর, ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা মামলা দিয়ে হয়রানির হুমকি দেওয়া হতো। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের পরিচয়, বক্তব্য এবং নির্দিষ্ট ঘটনার তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
করোনা সহায়তা পাইয়ে দেওয়ার নামে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
করোনাভাইরাস মহামারির সময় সাধারণ মানুষের দুর্দশাকে কাজে লাগিয়ে সরকারি আর্থিক সহায়তা ও ত্রাণ পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে শেখর চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় বহু মানুষ কর্মহীন হয়ে আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন। সরকারি সহায়তা পাওয়ার আশায় থাকা অসহায় মানুষদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হলেও তাঁদের প্রত্যাশিত সহায়তা পাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। সংকটের সময় সহায়তার আশ্বাস দিয়ে অর্থ নেওয়ার অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল বলে দাবি করা হচ্ছে। তবে এ ঘটনায় কতজন ভুক্তভোগী ছিলেন, কী পরিমাণ অর্থ নেওয়া হয়েছিল এবং এ বিষয়ে কোনো মামলা বা তদন্ত হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
রমজান মাসেও হকারদের কাছ থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
শেখর চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে ফুটপাতের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও হকারদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, পবিত্র রমজান মাসে ইফতার ও সেহরির খরচ জোগাতে ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করা হকারদের কাছ থেকেও টাকা দাবি করা হতো। দিনভর পরিশ্রম করে সামান্য আয় করা এসব ব্যবসায়ী নির্ধারিত অর্থ দিতে না পারলে তাঁদের ভয়ভীতি দেখানো এবং শারীরিক ও মানসিকভাবে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে। বরিশাল সিটি করপোরেশনের সামনের সড়ক ও আশপাশের জনবহুল ফুটপাতেও চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের অর্থ আদায়ের কারণে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের একটি অংশ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রত্যক্ষদর্শী, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সময়ের অভিযোগ বা মামলার নথি গুরুত্বপূর্ণ।
দলীয় পদ থেকে বহিষ্কারের পর রাজনৈতিক বলয় পরিবর্তনের অভিযোগ
রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার এবং দলীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে শেখর চন্দ্র দাসের সঙ্গে তৎকালীন বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র ও মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহর বিরোধের কথা উল্লেখ করা হয়েছে অভিযোগসংশ্লিষ্ট বিবরণে। ওই বিবরণ অনুযায়ী, একপর্যায়ে তাঁকে দলীয় পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে তিনি খোকন সেরনিয়াবাতের রাজনৈতিক বলয়ে যুক্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে খোকন সেরনিয়াবাতের পক্ষে প্রভাব বিস্তার, পেশিশক্তি ব্যবহার এবং ভোটের অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগও তোলা হয়েছে। নির্বাচনের আগে খোকন সেরনিয়াবাতের সঙ্গে শেখর চন্দ্র দাসের একটি বৈঠকের ছবিও এ প্রতিবেদনের সঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে শুধু বৈঠকের ছবি দিয়ে নির্বাচনে অনিয়ম বা অপরাধে সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রমাণিত হয় না। এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং নির্ভরযোগ্য নথি প্রয়োজন।
কুয়াকাটায় পাঁচতলা ‘হোটেল সি-গাল’, মালিকানা ও অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন
শেখর চন্দ্র দাসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কুয়াকাটায় ‘হোটেল সি-গাল’ নামে পাঁচতলা একটি আবাসিক হোটেল নির্মাণ। অভিযোগকারীদের দাবি, বরিশাল নগরীতে চাঁদাবাজির মাধ্যমে অর্জিত অর্থের একটি অংশ ব্যবহার করে পটুয়াখালীর কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত এলাকায় হোটেলটি নির্মাণ করা হয়েছে। হোটেলটির মালিকানা শেখর চন্দ্র দাস ও তাঁর পরিবারের বলে দাবি করা হলেও জমির দলিল, নিবন্ধন, ভবন নির্মাণের অনুমোদন, ব্যবসায়িক নথি এবং অর্থের উৎসসংক্রান্ত তথ্য যাচাই ছাড়া এ দাবিকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যায় না। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ভূমি অফিস, নিবন্ধন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় প্রশাসন এবং প্রয়োজন হলে দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে সম্পদ অর্জনের উৎস অনুসন্ধানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শেখর চন্দ্র দাস আত্মগোপনে রয়েছেন এবং কুয়াকাটার ওই হোটেলকে আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর নামে পরিচালিত অ্যাকাউন্ট থেকে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বিরোধিতায় বিভিন্ন বক্তব্য ও রাজনৈতিক প্রচার চালানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে। এ ছাড়া বরিশালে ঝটিকা মিছিলসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কিছু ব্যক্তি কুয়াকাটার হোটেলটিতে আশ্রয় নেন এবং আড়ালে থেকে তিনি তাঁদের অর্থায়ন করেন বলে অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি। তবে তাঁর বর্তমান অবস্থান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্টগুলোর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ এবং কথিত অর্থায়নের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া প্রয়োজন। অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা হলে হোটেলটির মালিকানা ও অর্থের উৎস সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য সামনে আসতে পারে।
২০২৪ সালের ৪ আগস্টের সহিংসতা ও মামলার অভিযোগ
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে বরিশালে সংঘটিত রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় শেখর চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট বরিশাল টাউন হল এলাকার বিএনপি কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলা হয়েছে। এ ঘটনায় বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার নম্বর, সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো, এজাহারের বিবরণ এবং তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা যাচাই করে অভিযোগের সুনির্দিষ্ট আইনি অবস্থান নির্ধারণ করা প্রয়োজন। মামলায় অভিযুক্ত হওয়া এবং আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়; তাই তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ফলাফলই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য পাওয়া যায়নি শেখর চন্দ্র দাসের
এসব অভিযোগের বিষয়ে শেখর চন্দ্র দাসের বক্তব্য জানতে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তাঁর ব্যক্তিগত বা সংশ্লিষ্ট মেসেঞ্জার অ্যাকাউন্টে খুদে বার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বক্তব্য এ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রকাশ করা হবে।
পুলিশের বক্তব্য: একাধিক মামলা রয়েছে, গ্রেপ্তারে তৎপরতা চলছে
এ বিষয়ে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, শেখর চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর মামলা রয়েছে। তাঁকে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ তৎপর রয়েছে বলেও তিনি জানিয়েছেন। ওসির বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্তকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। তবে কোন কোন মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, সেসব মামলার বর্তমান অবস্থা এবং গ্রেপ্তারসংক্রান্ত কোনো পরোয়ানা রয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট নথি থেকে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
শেখর চন্দ্র দাসের বিরুদ্ধে উত্থাপিত চাঁদাবাজি, অর্থ আত্মসাৎ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে কুয়াকাটার পাঁচতলা হোটেলটির প্রকৃত মালিকানা, নির্মাণে ব্যবহৃত অর্থের উৎস এবং সংশ্লিষ্ট কোনো আর্থিক অনিয়ম রয়েছে কি না, তা অনুসন্ধানের দাবি উঠেছে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে তদন্ত ও আদালতের সিদ্ধান্তের আগে কোনো অভিযোগকেই প্রমাণিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা সমীচীন নয়।