কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রামে স্থানীয় সরকারের তিনটি নির্বাচন (ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা) ঘিরে উপজেলা সদর থেকে গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হালকা নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরপরই সারা দেশের মতো চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার নয়টি ইউনিয়নেও নির্বাচনী আমেজ তৈরি হয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলার আমিরাবাদ ইউনিয়নের প্যানেল চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলমকে নিয়ে তৃণমূল জনগণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এই আলোচনার প্রেক্ষাপটে আমিরাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য কয়েকজন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে যাওয়ার কথাও ভাবছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চেয়ারম্যান পদপ্রত্যাশী একজন বলেন, “জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি টানা তিনবার আমিরাবাদ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) নির্বাচিত হয়েছেন। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করায় তিনি মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর বিপক্ষে নির্বাচন করা বোকামির শামিল। তাই আগে থেকেই নির্বাচন থেকে সরে যাওয়াই ভালো বলে আমি মনে করি।”
স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়েছেন।
চট্টগ্রামের ১৫টি উপজেলা, ১৫টি পৌরসভা ও ১৯৪টি ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং পৌরসভাগুলোর সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীরা প্রায় প্রতিদিন এলাকায় যাচ্ছেন। তাঁরা স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সঙ্গে নিয়মিত মতবিনিময় করছেন। রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন। এলাকার উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক, মানবিক ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছেন এবং উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। অনেকেই নগরীর অভিজাত হোটেলেও বৈঠক করছেন বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনায় বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের কথা জানানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রস্তুতি শুরু করেছে।
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য আগেভাগেই প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও পৌরসভার ভোটকেন্দ্র পরিদর্শন করে তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। পাশাপাশি ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা ও উপজেলা নির্বাচনের জন্য ভোটার তালিকাও হালনাগাদ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ বশির আহমেদ বলেন, “স্থানীয় সরকার নির্বাচনের বিষয়ে আমরা সব ধরনের প্রস্তুতি গুছিয়ে রাখছি। ভোটকেন্দ্র পরিদর্শনের পাশাপাশি ভোটার তালিকা প্রস্তুতের কাজও চলছে।”
চট্টগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ১৫টি উপজেলা, ১৯৪টি ইউনিয়ন পরিষদ এবং ১৫টি পৌরসভা রয়েছে।
উপজেলাগুলো হলো— মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, সন্দ্বীপ, ফটিকছড়ি, হাটহাজারী, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, আনোয়ারা, কর্ণফুলী, পটিয়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া ও বাঁশখালী।
পৌরসভাগুলো হলো— মীরসরাই, বারইয়ারহাট, সন্দ্বীপ, পটিয়া, রাউজান, সাতকানিয়া, বাঁশখালী, চন্দনাইশ, সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, দোহাজারী, রাঙ্গুনিয়া, বোয়ালখালী, ফটিকছড়ি ও নাজিরহাট পৌরসভা।
সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকায় সম্পৃক্ততা বাড়াচ্ছেন
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বর্ষা মৌসুম শেষে সেপ্টেম্বর অথবা অক্টোবর থেকে পর্যায়ক্রমে সারা দেশে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।
পর্যায়ক্রমে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ ও সিটি করপোরেশন— এই পাঁচ ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। তবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই সারা দেশের মতো চট্টগ্রামেও স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য প্রার্থীরা জনসম্পৃক্ততা বাড়িয়ে চলেছেন। তাঁরা এলাকার উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। জাতীয় নির্বাচনের পর স্থানীয় সরকারের এই তিনটি নির্বাচনকে ঘিরে উপজেলা সদর থেকে গ্রামীণ জনপদ পর্যন্ত এখন নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে।
ইসির পরিকল্পনায় আগে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কোন নির্বাচন আগে হবে, সেটি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আগে হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসছে বড় পরিবর্তন
জাতীয় নির্বাচনের মতো স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা, ইভিএম ব্যবহার না করা, পোস্টাল ভোটিং ব্যবস্থা বাতিল, প্রার্থীদের জামানতের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং দলীয় প্রতীকের পরিবর্তে নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজনের মতো বড় পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
এ ছাড়া অনলাইনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল, পলাতক আসামিদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ না দেওয়া, নির্দলীয়ভাবে নির্বাচন আয়োজন, স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য ১ শতাংশ ভোটারের স্বাক্ষর জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন না করার মতো বিষয়গুলোও কমিশনের বিবেচনায় রয়েছে।