স্টাফ রিপোর্টার:
জমি কেনাবেচাকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের বিরোধের জেরে প্রায় ৩ কোটি টাকার চেক ডিজঅনার মামলায় বিপাকে পড়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন লায়ন মোঃ শহিদুল ইসলাম। জমি ক্রয়ের জন্য বায়না চুক্তি, পরবর্তী সময়ে একাধিক দফায় অর্থ প্রদান, জমি বিক্রেতাকে উদ্ধারের জন্য চেক দেওয়া এবং পরে সেই চেকের পরিবর্তে নতুন চেক ও ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়ার অভিযোগকে কেন্দ্র করে এ বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীর। এ ঘটনায় আল আমীন ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সাথীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন শহিদুল ইসলাম। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগে বলা হয়, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কাজী জহিরুল ইসলাম সুমনের কাছ থেকে ২৫৭ শতক জমি কেনার উদ্দেশ্যে ১২ লাখ টাকা দিয়ে বায়না রেজিস্ট্রি করেন লায়ন মোঃ শহিদুল ইসলাম। এ সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মোঃ রাজিব। বায়না সম্পন্ন হওয়ার পর বিভিন্ন সময়ে জমি বিক্রেতা সুমন শহিদুল ইসলামের কাছ থেকে লিখিতভাবে আরও ৩৮ লাখ টাকা গ্রহণ করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এভাবে জমি কেনার উদ্দেশ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ লেনদেন হলেও পরবর্তী সময়ে জমির কাগজপত্রে সমস্যা দেখা দেওয়ায় জমিটি শহিদুল ইসলামের নামে রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, জমি কেনাবেচা ও দেনা-পাওনাকে কেন্দ্র করে পরবর্তী সময়ে জমির বিক্রেতা কাজী জহিরুল ইসলাম সুমনকে জোরপূর্বক অপহরণ করে আটকে রাখা হয়। এ ঘটনায় আল আমীন ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সাথীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা হয়েছে। সাথী একটি পার্লার পরিচালনা ও আদম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। সুমনকে আটকে রাখার খবর পাওয়ার পর তাঁরা আল আমীনের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। পরে আল আমীনের দ্বিতীয় স্ত্রী সাথীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাভারের ডিইউএসএসের ঠিকানায় গিয়ে সুমনের সন্ধান পান বলে দাবি করেন শহিদুল ইসলাম। এ সময় আল আমীন তাঁদের জানান, তাঁর পাওনা টাকার বিপরীতে চেক দেওয়া হলে সুমনকে ছেড়ে দেওয়া হবে।
অভিযোগ অনুযায়ী, সুমনকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে লায়ন মোঃ শহিদুল ইসলাম আল আমীনের হাতে মোট সাতটি চেক তুলে দেন। এরপর সুমনকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। এ সময় সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন আল আমীনের বন্ধু ও সমাজসেবক জিকু, মোঃ শাহ আলম (বিপুল) এবং মোঃ রাজিব। শহিদুল ইসলামের দাবি, তিনি মূলত জমি বিক্রেতা সুমনকে উদ্ধারের উদ্দেশ্যে চেকগুলো দিয়েছিলেন। আল আমীনের সঙ্গে তাঁর আগে থেকে সরাসরি কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক বা আর্থিক লেনদেন ছিল না। বরং জমি বিক্রেতা সুমনের সঙ্গে আল আমীনের দেনা-পাওনার বিষয়টি মীমাংসায় সহযোগিতা করতে গিয়ে তিনি নিজেই জটিলতার মধ্যে পড়েছেন।
শহিদুল ইসলামের ভাষ্য, জমির প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে সমস্যা থাকায় তিনি জমিটি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করতে পারেননি। জমিটির দখল নেওয়া বা সেখানে গিয়ে ভোগদখল করার সুযোগও পাননি বলে দাবি তাঁর। এ কারণে আল আমীনের কাছে দেওয়া সাতটি চেকের বিপরীতে অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে আল আমীন কৌশলে শালিসকারী রূপকের অফিসে যান এবং রূপকের মাধ্যমে শহিদুল ইসলামকে সেখানে ডেকে নেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সেখানে তাঁকে চাপ প্রয়োগ করে আগের দেওয়া সব চেকের অর্থ এককালীন পরিশোধের দাবি জানানো হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, পরবর্তী সময়ে রূপকের মাধ্যমে আলোচনায় সিদ্ধান্ত হয় যে, আল আমীনের কাছে থাকা আগের সাতটি চেক ফেরত দেওয়া হবে। এর বিনিময়ে নতুন তারিখ দিয়ে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার একটি চেক এবং একটি ফাঁকা স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর দিতে হবে বলে শহিদুল ইসলামকে চাপ দেওয়া হয়। পরিস্থিতির চাপে পড়ে তিনি আগের সাতটি চেক ফেরত পাওয়ার শর্তে নতুন করে ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার একটি চেক দেন এবং একটি ফাঁকা স্ট্যাম্প পেপারে স্বাক্ষর করেন বলে দাবি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, এ সময় রূপক মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।
শহিদুল ইসলামের দাবি, নতুন চেক ও স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর দেওয়ার পরদিন তিনি রূপকের মাধ্যমে আগের সাতটি চেক ফেরত চান। কিন্তু আল আমীন ও তাঁর সহযোগীরা চেকগুলো ফেরত না দিয়ে নানা ধরনের টালবাহানা শুরু করেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। পরবর্তী সময়ে আগের সাতটি চেকের সঙ্গে নতুন ১ কোটি ৬৫ লাখ টাকার চেক যুক্ত করে আল আমীন ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী সাথী চেক ডিজঅনারের মামলা করেন বলে অভিযোগ করেছেন শহিদুল ইসলাম। তাঁর দাবি, একই আর্থিক বিরোধকে কেন্দ্র করে আগের সাতটি চেক এবং পরবর্তী সময়ে দেওয়া নতুন চেক ব্যবহার করে তাঁর বিরুদ্ধে প্রায় ৩ কোটি থেকে ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকার চেক ডিজঅনারের দাবি তোলা হয়েছে। তবে মামলার নথি, চেকগুলোর প্রকৃত মূল্য, মামলা দায়েরের বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের তথ্য যাচাই করা না যাওয়ায় এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী শহিদুল ইসলামের প্রশ্ন, জমি কেনাবেচার লেনদেন ছিল কাজী জহিরুল ইসলাম সুমনের সঙ্গে; আল আমীনের সঙ্গে তাঁর সরাসরি কোনো লেনদেন না থাকা সত্ত্বেও কেন তাঁকে এত বড় আর্থিক ও আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে? তাঁর দাবি, জমির কাগজপত্রে সমস্যা থাকায় তিনি জমিটি নিজের নামে রেজিস্ট্রি করতে পারেননি, জমির দখলও পাননি। অন্যদিকে সুমনকে উদ্ধারের জন্য দেওয়া চেকগুলো ফেরত না পাওয়ায় তিনি নতুন করে বিপদে পড়েছেন। এ ঘটনায় প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং চেকগুলোর লেনদেনের পেছনের পরিস্থিতি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এদিকে লায়ন মোঃ শহিদুল ইসলাম ও তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে আল আমীনের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়ে মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রসচিব, আইনমন্ত্রীসহ বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত আবেদন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করলে জমি কেনাবেচা, চেক প্রদান, চেক ফেরত না দেওয়া এবং মামলা দায়েরের প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। অভিযোগকারীরা ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, সাক্ষীদের জবানবন্দি, ব্যাংকের নথি এবং চেকগুলোর ধারাবাহিকতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
অভিযোগে আল আমীনের বিদেশে যাতায়াত এবং স্বর্ণ আনা-নেওয়া নিয়েও কিছু দাবি করা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে কোনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা নথি বা নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা যাচ্ছে না। পুরো ঘটনার সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, আর্থিক লেনদেনের নথি, চেকের বিবরণ, জমির দলিলপত্র এবং মামলার কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগের বিষয়ে আল আমীন, সাথী, কাজী জহিরুল ইসলাম সুমন ও শালিসকারী রূপকের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা যাবে।