আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের বার্ষিক সাধারণ বিতর্ক শুরু হলেই একটি বিষয় প্রায় নিয়মিতভাবেই চোখে পড়ে—প্রথম বক্তব্যটি আসে ব্রাজিলের পক্ষ থেকে। এরপর বক্তব্য দেন সাধারণ পরিষদের আয়োজক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। ২০২৬ সালের ৮১তম অধিবেশনেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। ২২ সেপ্টেম্বর শুরু হওয়া সাধারণ বিতর্কে প্রথম বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা।
কিন্তু কেন প্রতিবছর ব্রাজিলকেই প্রথমে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়? এর পেছনে নেই কোনো বাধ্যতামূলক আইন বা জাতিসংঘ সনদের নির্দিষ্ট বিধান। বরং দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক রীতি ও ঐতিহাসিক চর্চার মধ্য দিয়ে এই অবস্থান তৈরি হয়েছে।
জাতিসংঘের নিজস্ব তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে সাধারণ পরিষদের বিতর্কে প্রথম বক্তা হওয়ার বিষয়ে অনেক দেশই আগ্রহ দেখাত না। সেই সময় ব্রাজিল স্বেচ্ছায় প্রথম বক্তব্য দেওয়ার দায়িত্ব নিতে এগিয়ে আসে। ধীরে ধীরে এই চর্চাই একটি দীর্ঘস্থায়ী ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ১৯৫৫ সালের দিকে এ রীতি দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এর সঙ্গে ব্রাজিলের প্রাথমিক কূটনৈতিক ভূমিকারও সম্পর্ক রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। ১৯৪৭ সালে ব্রাজিলের কূটনীতিক ওসভালদো আরানিয়া জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের প্রথম বিশেষ অধিবেশনের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই বছর তিনি দ্বিতীয় সাধারণ অধিবেশনেরও সভাপতি ছিলেন। জাতিসংঘের বিভিন্ন তথ্য ও নথিতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে।
বিশেষ করে ফিলিস্তিন প্রশ্নে জাতিসংঘের আলোচনায় আরানিয়ার ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৭ সালের সাধারণ পরিষদের বিশেষ অধিবেশনে তিনি সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময় ফিলিস্তিন ইস্যুতে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া এগিয়ে যায়।
ব্রাজিলের প্রথমে বক্তব্য দেওয়ার পেছনে আরও কিছু ঐতিহাসিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। একটি ব্যাখ্যা হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় ব্রাজিলের সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবে এই সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তবে এসব ব্যাখ্যার সবগুলো জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নথিভুক্ত নয়।
আরেকটি বিষয় হলো, ব্রাজিলকে প্রথম বক্তা হিসেবে নির্ধারণের কোনো স্থায়ী বিধান জাতিসংঘের কার্যপ্রণালীতে নেই। সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্কে বক্তাদের ক্রম নির্ধারণে বিভিন্ন বিষয় বিবেচনা করা হয়। এর মধ্যে প্রতিনিধিত্বের স্তর, ভৌগোলিক ভারসাম্য এবং বক্তব্য দেওয়ার অনুরোধের সময়সহ নানা বিষয় থাকে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রচলিত ধারা হলো—ব্রাজিলের পর বক্তব্য দেন স্বাগতিক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। এরপর অন্যান্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও অন্যান্য প্রতিনিধিদের বক্তব্যের পালা আসে।
ব্রাজিলের এই প্রথম বক্তার অবস্থান খুব কম ক্ষেত্রেই পরিবর্তিত হয়েছে। ফলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাধারণ বিতর্ক শুরু হলেই ব্রাজিলের নেতার বক্তব্য দিয়ে অধিবেশনের সূচনা হওয়া এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির পরিচিত একটি দৃশ্য।
সব মিলিয়ে, জাতিসংঘে ব্রাজিলের প্রথম বক্তব্য দেওয়ার বিষয়টি কোনো আনুষ্ঠানিক আইন নয়; বরং ইতিহাস, কূটনৈতিক সৌজন্য এবং দীর্ঘদিনের চর্চায় প্রতিষ্ঠিত একটি রীতি। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে চলে আসা এই ঐতিহ্য আজও সাধারণ পরিষদের বার্ষিক বিতর্কের সূচনায় বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।