মোঃ আনজার শাহ:
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলায় ঘটে গেছে এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে সংবাদ প্রকাশের কুৎসিত অভিযোগ তুলে এবং জীবিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে “রুহের মাগফিরাত” কামনা করে পোস্ট দেওয়ার ঘটনায় পুরো সাংবাদিক মহলে তীব্র ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাটি এখন শুধু বরুড়ায় নয়, ছড়িয়ে পড়েছে সারা দেশে। সাইবার অপরাধ ও সাংবাদিক অবমাননার অভিযোগে আইনি পদক্ষেপের জোরালো দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ঘটনার শুরু যেভাবে, বরুড়া উপজেলা ফুটবল দল সম্প্রতি কুমিল্লা জেলা পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় গৌরবময় চ্যাম্পিয়ন হয়। এই অর্জনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রত্যাশা অনুযায়ী সংবাদ প্রচার না হওয়ায় ক্ষুব্ধ হন উপজেলার স্থানীয় ব্যক্তিত্ব নাজমুল ইসলাম সাদ্দাম। ক্ষোভের বশে তিনি তাঁর ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি পোস্ট প্রকাশ করেন।
সেই পোস্টে তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন, “পেমেন্ট ছাড়া বরুড়ার কিছু সাংবাদিক কোনো পোস্ট কিংবা নিউজ করে না।” শুধু তাই নয়, পোস্টে এবং মন্তব্যের ঘরে জীবিত সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে “সকল সাংবাদিকদের রুহের মাগফিরাত কামনা করা হচ্ছে” বলে উল্লেখ করা হয়, যা মূলত জীবিত মানুষকে মৃত সাব্যস্ত করার শামিল।
পোস্টটি মুহূর্তের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায়। শুরু হয় একের পর এক কুরুচিপূর্ণ ও অশালীন মন্তব্যের ঢল, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ আকার দেয়।
সাংবাদিক মহলে আগুন জ্বলে ওঠে, পোস্টটি ভাইরাল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বরুড়া প্রেসক্লাবসহ স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ক্ষুব্ধ সাংবাদিকরা একজোট হয়ে এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানান এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন।
এই প্রেক্ষাপটে বরুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইলিয়াস আহমেদ তাঁর নিজস্ব ভেরিফাইড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ প্রতিবাদলিপি প্রকাশ করেন। প্রতিবাদলিপিতে তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় বলেন, “সাংবাদিকদের সম্মান রক্ষা ও দায়িত্বশীল আচরণ এখন সময়ের দাবি। একজনের ভুল বা সীমাবদ্ধতার দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের উপর চাপানো কখনোই ন্যায্য নয়। এ ধরনের বক্তব্য একটি পেশাজীবী সমাজকে সরাসরি অবমাননা করার শামিল।”
ইসলামিক দৃষ্টিকোণেও প্রশ্ন, প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক ইলিয়াস আহমেদ তাঁর প্রতিবাদলিপিতে ধর্মীয় দিক থেকেও বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি বলেন, জীবিত মানুষের রুহের মাগফিরাত কামনা করা ইসলামের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অশোভন ও অগ্রহণযোগ্য। তিনি প্রশ্ন রাখেন, যিনি এ মন্তব্য করেছেন, তিনি কি আদৌ ধর্মীয় মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন?
সাংবাদিকরা কি দায়মুক্ত?
প্রেসক্লাব সাধারণ সম্পাদক তাঁর প্রতিবাদলিপিতে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেন। তিনি বলেন, সাংবাদিকরা কোনো অলৌকিক শক্তির অধিকারী নন যে বিনা তথ্যে সব সংবাদ নিজে থেকেই জেনে যাবেন। যেকোনো অনুষ্ঠান, খেলাধুলা বা অর্জনের সংবাদ প্রচারের জন্য সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের প্রেস রিলিজ, প্রয়োজনীয় তথ্য ও সহযোগিতা প্রদান করা অপরিহার্য। তথ্য না দিয়ে পরবর্তীতে নেতিবাচক সমালোচনা করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয়।
আইনি পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি, বরুড়া প্রেসক্লাব সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, বিতর্কিত পোস্ট ও সমস্ত কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যের স্ক্রিনশট ইতিমধ্যে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। সাংবাদিক সমাজকে পরিকল্পিতভাবে হেয় ও অবমাননা করার অভিযোগে সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এর আওতায় মামলা দায়ের করা যেতে পারে।
প্রেসক্লাবের পক্ষ থেকে সতর্ক করে বলা হয়েছে, যারা এ ধরনের অশালীন ও মানহানিকর পোস্ট ও মন্তব্য করেছেন, তাদের বিরুদ্ধেও আইনি পথে হাঁটতে দ্বিধা করা হবে না।
সারা দেশের সাংবাদিক সমাজের নিন্দা, এই ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে কুমিল্লা জেলাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সাংবাদিক সংগঠনগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেছে। অনেকেই দাবি করছেন, এ ধরনের ঘটনা শুধু সাংবাদিকদের নয়, বরং গোটা মুক্ত গণমাধ্যমের উপর আঘাত।
অভিযুক্তের বক্তব্য পাওয়া যায়নি, এ বিষয়ে অভিযুক্ত নাজমুল ইসলাম সাদ্দামের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও এখন পর্যন্ত তাঁর কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তিনি বিষয়টি নিয়ে কোনো প্রকাশ্য ক্ষমাপ্রার্থনাও করেননি বলে জানা গেছে।
বরুড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ ইলিয়াস আহমেদ সবার উদ্দেশ্যে বলেন, “মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু ভাষা ও আচরণে শালীনতা বজায় রাখা প্রতিটি সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব। আমরা সুন্দর, সচেতন ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধসম্পন্ন সমাজ গড়ে তুলতে চাই।”