মো. আব্দুল গফুর সিকদার:
টানা ছয় দিনের ভারী বর্ষণে ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও হাঁটু, কোথাও কোমরসমান পানিতে তলিয়ে গেছে বসতবাড়ি, রাস্তাঘাট ও নিচু এলাকা। এতে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের অন্তত ১০টি গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।
শুক্রবার (১০ জুলাই) সকালেও থেমে থেমে বৃষ্টি অব্যাহত ছিল। এর সঙ্গে দমকা হাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতায় অনেক পরিবার ঘরবন্দি হয়ে পড়েছে। অনেক বাড়িতে ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত পানি জমে থাকায় রান্নাবান্না বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি দেখা দিয়েছে বিশুদ্ধ পানির সংকট।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টানা বৃষ্টিতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে দিনমজুর ও নিম্ন আয়ের মানুষ কাজে যেতে না পারায় পরিবার নিয়ে সংকটে রয়েছেন। অনেক পরিবার শুকনো খাবার ও নিরাপদ পানির অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
মনপুরা উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী মো. আশরাফ হোসেন বলেন, “সারা দেশের মতো মনপুরাতেও কয়েক দিন ধরে ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। জলাবদ্ধতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে শিশুদের প্রতি বাড়তি যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।”
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ডিভিশন-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসাফউদ্দৌলা জানান, উজানের ঢল ও মেঘনা নদীর ভাটার প্রভাবে বর্তমানে নদীর পানি বিপৎসীমার ১ দশমিক ২৩ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে বিকেলের জোয়ারে নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
ভোররাতের জোয়ারে বেড়িবাঁধবিহীন চর কলাতলী ইউনিয়নের কাজীরচর ও ঢালচরের নিম্নাঞ্চল ২ থেকে ৩ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাজিরহাট ইউনিয়নের চরযতিন, দাসেরহাট, সোনারচর ও চরজ্ঞান, সাকুচিয়া ইউনিয়নের চরগোয়ালিয়া ও মাস্টারহাট, দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের রহমানপুর এবং মনপুরা ইউনিয়নের কাউয়ারটেক ও আন্দিরপাড় গ্রামের অধিকাংশ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে রয়েছে। অনেক বাড়িঘরের ভেতরে ৩ থেকে ৪ ফুট পর্যন্ত পানি জমে আছে।
হাজিরহাট ইউনিয়নের কয়েকটি ওয়ার্ডে পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুক। স্থানীয়দের ভাষ্য, জনপ্রতিনিধিদের দৃশ্যমান উদ্যোগ না থাকলেও সমাজকর্মী ও সংবাদকর্মী মেহেদী হাসান এবং আবদুর রহমান সোয়েবের উদ্যোগে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের কাজ চলছে। একইভাবে দক্ষিণ সাকুচিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় স্থানীয় বিএনপি নেতা সিরাজ পালোয়ানের নেতৃত্বে বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পানিবন্দি বাসিন্দাদের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা ও বন্যাদুর্গত মানুষের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালিত হলেও মনপুরায় এখনো তেমন কোনো দৃশ্যমান সরকারি ত্রাণ কার্যক্রম শুরু হয়নি। তাদের দাবি, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন বা জরুরি সহায়তার দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে শিশু, বৃদ্ধ ও নারীদের নিয়ে অনেক পরিবার চরম কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাবাসী দ্রুত ত্রাণ, শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।