মোঃআনজার শাহ :-
সরকারি হাসপাতাল, অথচ নেই সরকারি ডাক্তার। চিকিৎসার আশায় গরু-ছাগল নিয়ে যান কৃষক, ফিরে আসেন হতাশা নিয়ে। কারও গাভী প্রসব করে মৃত বাছুর, কারও ছাগল অপারেশনের পর জবাই করতে বলা হয়। অভিযোগ করলে মেলে কেবল ‘দেখছি, দেখব’ এই একটিই উত্তর। কুমিল্লার বরুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই নীরব অরাজকতা।
সরেজমিনে যা দেখা গেল,সরেজমিন পরিদর্শনে উঠে আসে এক উদ্বেগজনক চিত্র। নির্ধারিত অফিস সময়ে হাসপাতালের অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মস্থলে অনুপস্থিত। কেউ কেউ সকাল ১১টার পরেও অফিসে আসেননি।
আরও চমকে দেওয়ার মতো দৃশ্য হাসপাতালের ভেতরে কর্মকর্তাদের বসার কক্ষেই রাখা একটি মোটরসাইকেল। সেই একই কক্ষে চলছে প্রাণীদের চিকিৎসাসেবা। হাসপাতাল না গ্যারেজ পার্থক্য করা কঠিন।
পাঁচ মাস ধরে ‘গায়েব’ দায়িত্বশীল কর্মকর্তা,
স্থানীয়দের অভিযোগ, গত পাঁচ থেকে ছয় মাস ধরে বরুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাসরিন সুলতানা তনু অধিকাংশ সময় অফিসে অনুপস্থিত থাকেন। সরকারি আদেশে বিদেশে পিএইচডি করতে যাওয়ার প্রক্রিয়া নিয়ে ব্যস্ত থাকায় অফিসে সময় দিতে পারছেন না বলে জানা গেছে। এমনকি তিনি কখন আসেন, কখন যান সে বিষয়েও উপজেলা প্রশাসনের কাছে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।
অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে ডা. নাসরিন সুলতানা তনু বলেন, “কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত অফিস করেন। কারও ব্যক্তিগত কাজ থাকতে পারে। কেউ বাজারে গেছে, কেউ লাঞ্চে গেছে।” অফিসে নিয়মিত না আসার বিষয়ে তিনি বলেন, “আমার জিওর বিষয়ে তদারকি করতে হয়েছে। না হলে ফাইল পড়ে থাকত। জেলা কর্মকর্তাকে জানিয়েই গেছি।”
অদক্ষ কর্মকর্তার হাতে প্রেসক্রিপশন, আইন লঙ্ঘন প্রকাশ্যে,দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অনুপস্থিতির সুযোগে হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নুরুজ্জামান। শুধু চিকিৎসাই নয়, লিখছেন ওষুধের প্রেসক্রিপশনও যা সম্পূর্ণ বেআইনি।
নুরুজ্জামান নিজেই স্বীকার করেন, “নিয়ম অনুযায়ী প্রেসক্রিপশন লেখার কথা নয়, তারপরও বাস্তবতার কারণে করছি।”
এ বিষয়ে উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাসরিন সুলতানা তনু বলেন, “উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা অবশ্যই প্রেসক্রিপশন লিখতে পারেন। হয়তো ভয় পেয়ে বলেছেন যে তিনি লিখতে পারেন না।”
তবে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সামছুল আলম সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলেন। তিনি স্পষ্ট জানান, “ওষুধের প্রেসক্রিপশন লেখার ক্ষমতা সরকার কেবল ভেটেরিনারি সার্জনদের দিয়েছে।” অর্থাৎ উপজেলা কর্মকর্তার বক্তব্য সরাসরি আইনবিরোধী এবং তাঁর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
ভুল চিকিৎসায় মৃত বাছুর, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক,শাকপুর গ্রামের কৃষক ফারভেজ হোসেনের অভিযোগ হৃদয়বিদারক। তিনি জানান, তাঁর গাভীর গর্ভধারণ পরীক্ষার জন্য হাসপাতালে যান। দায়িত্বরত ব্যক্তি পরীক্ষা করে জানান গাভী গর্ভধারণ করেনি এবং বিভিন্ন ওষুধ ও ইনজেকশন দেন। কিন্তু প্রায় এক মাস পর গাভীটি একটি মৃত বাছুর প্রসব করে।
ফারভেজ হোসেন বলেন, “ভুল চিকিৎসার কারণেই বাছুরটি মারা গেছে বলে আমি মনে করি। গাভীটি দুর্বল হয়ে পড়ে, বাধ্য হয়ে কম দামে বিক্রি করতে হয়েছে। বিষয়টি প্রাণিসম্পদ দপ্তরকে জানিয়েও কোনো প্রতিকার পাইনি শুধু ‘দেখছি, দেখব’ বলে সময়ক্ষেপণ করা হয়েছে।”
তিনি আরও অভিযোগ করেন, সাইফুল নামে এক ব্যক্তি সরকারি ডাক্তার পরিচয়ে চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং প্রাণিসম্পদ বিভাগের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর যোগসাজশ রয়েছে। সরকারি ভ্যাকসিন কীভাবে তিনি ব্যবহার করছেন, সেটিও বড় প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন ফারভেজ।
অপারেশনের পর ছাগল জবাইয়ের পরামর্শ,পয়ালগাছা ইউনিয়নের হাটপুকুরিয়া গ্রামের স্মাইল হোসেনের অভিজ্ঞতাও কম মর্মান্তিক নয়। অসুস্থ ছাগল নিয়ে হাসপাতালে গেলে প্রথমদিন জানানো হয় ডাক্তার নেই, পরদিন আসতে বলা হয়। পরেরদিন গেলে বলা হয় অপারেশন করতে হবে। দুই জায়গায় কেটে সেলাই করার পর কর্তৃপক্ষ পরামর্শ দেন ছাগলটি বাড়িতে নিয়ে জবাই করে ফেলতে।
স্মাইল হোসেন ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “চিকিৎসার আশায় হাসপাতালে গিয়েছিলাম। সময় ও টাকা দুটোই নষ্ট হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ছাগলটিও জবাই করতে হলো।”
জেলা কর্মকর্তা যা বললেন,জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. সামছুল আলম স্বীকার করেন, উপজেলা কর্মকর্তা তাঁর কাছে তিন থেকে চারবার মৌখিকভাবে ছুটির অনুমতি চেয়েছেন। হাসপাতালের কক্ষে মোটরসাইকেল রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, “রুমের ভেতরে বাইক রাখা অবশ্যই সমীচীন নয়। এতে অফিসের সৌন্দর্য ব্যাহত হয়।”
দাবি উঠছে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের,স্থানীয় সচেতন মহল ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা দাবি জানাচ্ছেন,
এক.বরুড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে।
দুই. অবৈধভাবে প্রেসক্রিপশন লেখা ও সরকারি ভ্যাকসিন অপব্যবহারের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিন. দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিতে হবে।
চার. দ্রুত একজন যোগ্য ভেটেরিনারি সার্জন নিয়োগ দিয়ে হাসপাতালের স্বাভাবিক সেবা নিশ্চিত করতে হবে।
বরুড়ার কৃষক ও প্রাণিসম্পদ খাতের সেবাপ্রত্যাশীরা দীর্ঘদিন ধরে এই অব্যবস্থার শিকার। একটি সরকারি হাসপাতাল যখন কৃষকের পশুকে সুস্থ করার বদলে আরও ক্ষতি করে তখন প্রশ্ন ওঠে, এই দপ্তর কার স্বার্থে চলছে? জবাব দেওয়ার সময় এসেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের।