আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে সুপ্রিম কোর্ট অভিমুখে পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছে বিরোধী দলগুলো। এ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লিতে নিরাপত্তা জোরদার করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১২ সাংবাদিক আটক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগও করেছেন সাংবাদিকরা।
সোমবার (১২ অক্টোবর) ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-এর এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৬টা থেকে দিল্লির বিভিন্ন সড়কে যান চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। ধৌলা কুয়াঁ ফ্লাইওভার, মান্ডি হাউস, ঝান্ডেওয়ালান, পঞ্চকুয়াঁ, কনট প্লেস, প্যাটেল চক, লোদি রোড ফ্লাইওভার, ভিকাজি কামা প্লেস, মতিবাগ ফ্লাইওভার, অশোক রোড, যন্তর মন্তর রোড, সংসদ মার্গ ও টলস্টয় মার্গসহ প্রায় ৩০টি এলাকায় যান চলাচল ব্যাহত হয়।
দিল্লি ট্রাফিক পুলিশ জরুরি প্রয়োজন ছাড়া এসব সড়ক এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে। পাশাপাশি বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও বিমানবন্দরে যাতায়াতের জন্য হাতে অতিরিক্ত সময় রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নিরাপত্তা পরিকল্পনার অংশ হিসেবে নিউ দিল্লি জেলাকে ২০টি জোনে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি জোনে ডেপুটি পুলিশ কমিশনার পদমর্যাদার কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন। এ ছাড়া ৩৭টি স্থানে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এর আগে শনিবারের বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘিরে প্রায় ৪১ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। সেদিন ভারতের বিভিন্ন রাজ্যের সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী এবং ককোরোচ জনতা পার্টির (সিজিপি) নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রাঙ্কাসহ এক হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়।
সিজিপির মুখপাত্র আশুতোষ রাঙ্কা জানিয়েছেন, তিনি, সৌরভ দাস ও রত্না সিং এক দিনের প্রতিবাদ কর্মসূচির অনুমতি চাইতে পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানায় যাবেন। একই দিনে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসও পদযাত্রার ঘোষণা দিয়েছে।
সংবাদ সংগ্রহের সময় আটক সাংবাদিকরা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রোববার (১১ অক্টোবর) প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় অন্তত ১২ সাংবাদিককে আটক করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ‘হিন্দুস্তান’-এর একজন প্রতিবেদক, ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস হিন্দি’র তিন সাংবাদিক, ‘দ্য হিন্দু’র একজন প্রতিবেদক এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের কয়েকজন ক্যামেরাপারসন রয়েছেন।
অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) ডাকা বিক্ষোভের খবর সংগ্রহের সময় এসব আটকের ঘটনা ঘটে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পুলিশ তাঁদের কথা শোনেনি। কয়েকজনের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
‘হিন্দুস্তান’-এর ২৭ বছর বয়সী প্রতিবেদক আশিস সিং জানান, বেলা আড়াইটার দিকে আরকে আশ্রম মার্গ এলাকায় বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহের সময় পুলিশ তাঁকে আটক করে। তাঁর অভিযোগ, সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে পরিচয়পত্র দেখানোর পরও পুলিশ তাঁকে ধাক্কা দেয় এবং ভারী কোনো বস্তু দিয়ে আঘাত করে।
আশিসের ভাষ্য, তিনি ক্যামেরায় আটকের ঘটনা ধারণ করছিলেন। এ সময় পুলিশ সদস্যরা তাঁকে ধাক্কা দিতে শুরু করেন। পরে এক আলোকচিত্রীর সঙ্গে তাঁকে জোর করে একটি বাসে তোলা হয়। প্রায় ২০ থেকে ৩০ মিনিট পর বাসটি মন্দির মার্গ এলাকায় পৌঁছালে তাঁরা নেমে যান।
আশিস আরও বলেন, পুলিশ তাঁদের ফোন কেড়ে নিয়ে ছবি ও ভিডিও মুছে ফেলতে পারে—এমন আশঙ্কা তাঁর মধ্যে তৈরি হয়েছিল।
একটি জাতীয় সংবাদ সংস্থার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আলোকচিত্রীও জানান, বিক্ষোভকারীদের আটকের ছবি তোলার সময় তাঁকে আটক করা হয়। তাঁর দাবি, পুলিশ প্রথমে পথচারীদের সরিয়ে দেয়, পরে সাংবাদিকদের আটক করতে শুরু করে। ছবি ও ভিডিও হারানোর আশঙ্কায় তিনি ক্যামেরার মেমোরি কার্ড লুকিয়ে রাখেন।
৪৫ মিনিট পর মুক্তি পান তিন সাংবাদিক
‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানায়, তাদের তিন সাংবাদিক শাশ্বত, সিয়া ও বিজয়কে কনট প্লেস এলাকা থেকে আটক করে ছত্রসাল স্টেডিয়ামে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রায় ৪৫ মিনিট পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। আটকস্থল থেকে স্টেডিয়ামটির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার।
এ ছাড়া সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার মধ্যে ‘দ্য হিন্দু’র এক নারী প্রতিবেদককেও সাময়িকভাবে আটক করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তাঁকে ধাক্কা দিয়ে একটি বাসে তোলা হয়েছিল। পরে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে প্রতিবাদ জানালে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
ওই প্রতিবেদক জানান, কনট প্লেসে নিজের ভিডিও ধারণ করার সময় পুলিশ সদস্যরা এসে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন এবং পরে আটক করেন। সংবাদ সংগ্রহের কাজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের আটকের বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
সাংবাদিকদের আটকের বিষয়ে দিল্লি পুলিশের মুখপাত্ররা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।