স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও জনবহুল এলাকা যাত্রাবাড়ীর ধলপুর সিটি পল্লী এলাকা এখন যেন মাদকের ‘গড়’ হয়ে উঠেছে। হিরোইন, ইয়াবা, গাঁজা থেকে শুরু করে মদ—সবই বিক্রি হচ্ছে জনসমাগমের মাঝে, এমনকি চায়ের দোকান বা সাধারণ ঘরবাড়িতেও। স্থানীয়দের অভিযোগ, এ অঞ্চলের মাদক ব্যবসার নেতৃত্বে আছেন ৪ ফুট ৮ ইঞ্চি উচ্চতার মাদক সম্রাট মাসুম, যিনি কয়েকবার গ্রেপ্তার হলেও দু’দিনের মধ্যে জামিনে বের হয়ে আবার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
এলাকার দুটি বিশেষ অঞ্চল—সিটি পল্লী ও আউটফল—মাদক ব্যবসায়ীদের আড্ডাখানা হিসেবে পরিচিত। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকার মাদক কেনাবেচা হয়। একটি পথচারী বলেন, “পুলিশ আসলেও সাময়িক সময়ের জন্য থেমে যায়, পরে আবার আগের মতোই লেনদেন শুরু হয়।”
মাদক ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যুবকরা চুরি, ছিনতাই ও সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে। এক স্থানীয় নারী বলেন, “আগে সন্ধ্যার পর বাচ্চা নিয়ে বাইরে যেতাম, এখন ভয়ে বের হই না। আতঙ্কই আতঙ্ক।” কিশোর ও যুবকদের মধ্যে ইয়াবা, ক্রিস্টালসহ নেশাজাতীয় মাদক দ্রব্যের ব্যবহার বেড়েই চলেছে। স্কুলছাত্রদের মধ্যে গ্যাং কালচার তৈরি হওয়ায় সমাজে আতঙ্ক তৈরি হচ্ছে।
মাসুম প্রায় অর্ধশত সাঙ্গপাঙ্গ নিয়ে চলাফেরা করেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, তার বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুললে বাহিনী নির্যাতন চালায়। দুই মাস আগে ডিবি পুলিশের অভিযান চালানোর সময় মাসুমের লাঠিয়াল বাহিনী তাদের ওপর হামলা চালিয়ে গাড়ি ভাঙচুর করেছিল। যদিও মামলা হয়েছে, কিন্তু মাসুম এখনো ধরা পড়েননি।
বর্তমানে, ২০২৫ সালের ৫ আগস্টের পর হাসিনার পতনের পরই মাসুমের মাদক ব্যবসার কাহিনি প্রকাশ পেয়েছে। জানা যায়, স্থানীয় কিছু দলীয় নেতাদের ছত্রছায়ায় এই ব্যবসা বিস্তৃত হয়েছে। তাদের প্রভাবের কারণে মাসুম আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। এমন পরিস্থিতিতেও প্রশাসন কোনো ভয় পাচ্ছে না।
স্থানীয়রা আরও অভিযোগ করেন, মাসুম প্রতিদিন যাত্রাবাড়ী থানায় লাখ টাকারও বেশি ঘুষ দিয়ে থাকেন। ফলে তার নামে কার্যকর কোনো মামলা হয়নি। রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মাদক ব্যবসা চালানো হয়। শুরুতে কিছু প্রভাবশালী আওয়ামী লীগ নেতার নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বর্তমানে অনেকেই অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত। একজন বাসিন্দা বলেন, “দল বদলায়, কিন্তু মাদকের ব্যবসা তো থামে না।”
যাত্রাবাড়ী থানার একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তথ্যদাতাদের মাধ্যমে কারা জড়িত তা শনাক্তের চেষ্টা চলছে। সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে সঙ্গে সঙ্গে অভিযান চালানো হবে। ডিসি স্যার বিষয়টি জানেন, বড় অভিযানের প্রস্তুতিও নিচ্ছি।” তবে স্থানীয়রা বলছেন, বছরের পর বছর ধরে এই মাদক সাম্রাজ্য অবাধে চলছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদক সমস্যা শুধুই আইন প্রয়োগের বিষয় নয়। দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সামাজিক অবহেলা এই সমস্যাকে আরও জটিল করছে। তারা মনে করেন, পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন, শিক্ষামূলক কার্যক্রম এবং পুলিশি তৎপরতা একসঙ্গে কার্যকর হলে সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।
স্থানীয়রা আশা প্রকাশ করছেন প্রশাসন মাদক ব্যবসায়ীদের দমন করবে এবং এলাকায় নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনবে। “আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রশাসন ও পুলিশ সক্রিয় হলে এই এলাকা আবার নিরাপদ হয়ে উঠবে,” বললেন একজন স্থানীয় শিক্ষার্থী।
যাত্রাবাড়ী ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের ১ নম্বর সিটি পল্লী এখন মাদক চক্রের আখড়া। সচেতন নাগরিক ও পুলিশি পদক্ষেপ ছাড়া এই সমস্যা দূর করা কঠিন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।