বড়াইগ্রাম প্রতিনিধি:
দীর্ঘ দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে কলেজে শিক্ষকতা করেও এমপিওভুক্তির সুযোগ পাননি। নিয়মিত পাঠদান করলেও জোটেনি কোনো বেতন-ভাতা। সংসারের খরচ চালাতে গিয়ে একপর্যায়ে ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে বিক্রি করতে হয়েছে নিজের শেষ সম্বল বাড়ি-ভিটাও। অবশেষে আর্থিক সংকট ও মানসিক হতাশার মধ্যে নাটোরের বড়াইগ্রামে আত্মহত্যা করেছেন শ্রী শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী মানিক (৫৬) নামে এক কলেজ প্রভাষক।
সোমবার সন্ধ্যায় উপজেলার বনপাড়া পৌরসভার দিয়ারপাড়া মহল্লায় ভাড়া বাসায় এ ঘটনা ঘটে। তিনি কালিকাপুর-বনপাড়া কৃষি ও কারিগরি কলেজের সাধারণ শাখার পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক ছিলেন। তিনি ওই এলাকার মৃত শ্যামা প্রসাদ চৌধুরীর ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০০৩ সালের ২৩ মার্চ কালিকাপুর-বনপাড়া কৃষি ও কারিগরি কলেজের উচ্চমাধ্যমিক সাধারণ শাখায় পদার্থবিদ্যা বিভাগের প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন শৈলেন্দ্র কুমার চৌধুরী। এরপর থেকে দীর্ঘ সময় ধরে বিনা বেতনে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে আসছিলেন তিনি। কলেজটির কারিগরি শাখা এমপিওভুক্ত হলেও সাধারণ শাখা এমপিওভুক্ত না হওয়ায় তাঁর ভাগ্যে জোটেনি সরকারি বেতন-ভাতা কিংবা আর্থিক সুবিধা।
দীর্ঘদিন কোনো নিয়মিত আয় না থাকায় সংসার চালানো, পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় মেটানো এবং প্রয়োজনীয় খরচ বহন করতে গিয়ে ধীরে ধীরে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন তিনি। পরিস্থিতি সামাল দিতে একপর্যায়ে নিজের বসতভিটাও বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন। পরে স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে নিয়ে ভাড়া বাসায় বসবাস শুরু করেন।
স্বজন ও স্থানীয়দের বরাত দিয়ে জানা যায়, বাড়ি-ভিটা বিক্রি করেও ঋণের চাপ থেকে মুক্তি পাননি তিনি। দেনাদারদের পাওনা টাকা পরিশোধের চাপ এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক অনিশ্চয়তা তাঁকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। শিক্ষকতা পেশায় দীর্ঘ সময় কাটালেও নিজের ও পরিবারের জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা না পাওয়ায় হতাশা আরও বাড়তে থাকে।
ঘটনার দিন সন্ধ্যায় স্ত্রী ও সন্তানের অনুপস্থিতিতে তিনি ভাড়া বাসায় ইঁদুর মারার বিষাক্ত ট্যাবলেট সেবন করেন বলে জানা গেছে। পরে বিষয়টি বুঝতে পেরে প্রতিবেশীরা তাঁকে দ্রুত উদ্ধার করে নাটোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কলেজের নন-এমপিও প্রভাষক সোহেল রানা বলেন, ‘তিনি হয়তো মরে গিয়ে রক্ষা পেলেন, আমরা তো সেটাও পারছি না।’ দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করার পরও একজন শিক্ষকের ন্যূনতম জীবিকার নিশ্চয়তা না পাওয়াকে অত্যন্ত দুঃখজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এ বিষয়ে বড়াইগ্রাম থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মাহবুবুর রহমান জানান, এ ঘটনায় থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছে। মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।
দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেও বেতন-ভাতা না পাওয়া, আর্থিক অনিশ্চয়তা এবং ঋণের চাপে একজন শিক্ষকের এমন করুণ পরিণতির ঘটনায় স্থানীয় শিক্ষক ও সচেতন মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।