নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনে খসড়া অধ্যাদেশ

মোহাম্মদ হোসেন হ্যাপী:

নারায়ণগঞ্জ ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকাকে একটি পরিকল্পিত, আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব নগরীতে রূপান্তরের লক্ষ্যে সরকার **‘নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ’ (Narayanganj Development Authority – NDA)** গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে **গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়** একটি খসড়া অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছে। বর্তমানে খসড়া অধ্যাদেশটির ওপর সংশ্লিষ্ট দপ্তর, বিশেষজ্ঞ ও অংশীজনদের মতামত গ্রহণ করা হচ্ছে।

গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শীতলক্ষ্যা নদী তীরবর্তী এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাধার দখল, পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা ও দুর্যোগ ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি টেকসই নগর ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতেই এই উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিকল্পিত নগরায়ন ও পরিবেশ সুরক্ষাই মূল লক্ষ্য:

খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, প্রস্তাবিত নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান লক্ষ্যগুলো হলো—

* ভূ-প্রাকৃতিক ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা

* অপরিকল্পিত ও অবৈধ নগরায়ন নিয়ন্ত্রণ

* জলাধার, নদী ও খাল-বিল সংরক্ষণ

* দুর্যোগ সহনশীল নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা

* পর্যটন শিল্প ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিকাশ নিশ্চিত করা

বিশেষ করে শীতলক্ষ্যা নদী ও এর শাখা-প্রশাখার পানিপ্রবাহ রক্ষা এবং নগরীর সবুজ ও খোলা জায়গা সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে খসড়ায়।

কর্তৃপক্ষের কাঠামো ও নেতৃত্ব:

খসড়া অধ্যাদেশে নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সাংগঠনিক কাঠামোও নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী—

* একজন **চেয়ারম্যান**

* চারজন **সার্বক্ষণিক সদস্য**

* বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে মনোনীত আরও **পাঁচজন সদস্য**

চেয়ারম্যান ও চারজন সার্বক্ষণিক সদস্য কর্তৃপক্ষের পূর্ণকালীন কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন। চেয়ারম্যানের মেয়াদ হবে **তিন বছর** এবং কোনো ব্যক্তি সর্বোচ্চ **দুই মেয়াদের বেশি** চেয়ারম্যান বা সার্বক্ষণিক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।

মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনার ক্ষমতা:

অন্যান্য উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের মতো নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব ও ক্ষমতা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে খসড়া অধ্যাদেশে। এর আওতায় কর্তৃপক্ষ—

* পুরো নারায়ণগঞ্জ ও আওতাভুক্ত এলাকার জন্য একটি **মহাপরিকল্পনা (Master Plan)** প্রণয়ন করবে

* উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রয়োজনে ভূমি **ক্রয়, অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন ফি** ধার্য করতে পারবে

* মহাপরিকল্পনায় নির্ধারিত উদ্দেশ্য ব্যতীত কোনো ভূমি ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে পারবে

খসড়ায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মহাপরিকল্পনায় নির্ধারিত ব্যবহার ব্যতীত অন্য কোনো উদ্দেশ্যে ভূমি ব্যবহার করলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।

কঠোর শাস্তির বিধান:

খসড়া অধ্যাদেশে আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। কেউ কর্তৃপক্ষের বিধান অমান্য করলে

* সর্বোচ্চ **এক বছরের কারাদণ্ড**

* অথবা **১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা**

* অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হতে পারেন

বিশেষ করে **নদী, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাধার রক্ষায়** অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে।

জলাধার দখল ও ভরাটে শূন্য সহনশীলতা:

খসড়া অধ্যাদেশ অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া কোনো নদী, খাল, বিল বা প্রাকৃতিক জলাধারের পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করা যাবে না। কৃত্রিম জলাধার খনন বা নিচু ভূমি ভরাট করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বন্ধ করলে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষ যেকোনো অবৈধ খনন বা ভরাট কার্যক্রম **তাৎক্ষণিক বন্ধের নির্দেশ** দিতে পারবে।

* প্রথমবার অপরাধে **দুই বছরের কারাদণ্ড** অথবা **দুই লাখ টাকা জরিমানা**

* অপরাধের পুনরাবৃত্তি হলে **দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড** এবং **দুই থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড** দেওয়া হতে পারে

সংরক্ষণ আইন বহাল থাকবে:

খসড়া অধ্যাদেশে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, খেলার মাঠ, উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে **২০০০ সালের প্রচলিত সংরক্ষণ আইন** বহাল থাকবে এবং সেটিই কার্যকর হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নারায়ণগঞ্জ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ গঠিত হলে দীর্ঘদিনের অপরিকল্পিত নগরায়ন ও পরিবেশগত সমস্যার সমাধানে একটি কার্যকর কাঠামো তৈরি হবে। তবে খসড়া অধ্যাদেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা জরুরি—এমন মতও দিয়েছেন নগর পরিকল্পনাবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *