সূর্য আহমেদ মিঠুন :
নারায়ণগঞ্জের বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় রয়েছেন অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগর। তিনি নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রদলের সদ্য সাবেক সভাপতি এবং বর্তমানে সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পারিবারিকভাবেই ছোটবেলা থেকে বিএনপির রাজনীতির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আগ্রহ তৈরি হয়। সেই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক পথচলা শুরু হয়।
রাজনৈতিক জীবনের শুরু থেকেই ওয়ার্ড পর্যায় থেকে বিএনপির বিভিন্ন কর্মসূচি, আন্দোলন ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন তিনি। ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নারায়ণগঞ্জ বিএনপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে তাঁর নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা মিছিলে অংশ নেন। একই বছরের ২৭ অক্টোবর ঢাকায় বিএনপির মহাসমাবেশকে কেন্দ্র করে মহানগর ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে নয়াপল্টনে অবস্থান নেন তিনি। পরদিন ২৮ অক্টোবরের আন্দোলন চলাকালে তিনি চোখ, কপাল ও মাথায় গুলিবিদ্ধ হন বলে তাঁর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ওই ঘটনায় তাঁর একটি চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল।
২০২৪ সালের ২৭ জানুয়ারি ঢাকায় বিএনপির একটি কর্মসূচিতেও তাঁর নেতৃত্বে নারায়ণগঞ্জ মহানগর ছাত্রদলের বড় একটি মিছিল অংশ নেয়। এ ছাড়া বিভিন্ন জাতীয় ও দলীয় কর্মসূচি, শহীদ দিবস পালন এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় উপস্থিতি ছিল বলে জানা যায়।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে সিদ্ধিরগঞ্জ, ফতুল্লাসহ বিভিন্ন থানায় তাঁর বিরুদ্ধে মোট ২৪টি মামলা রয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ৩ অক্টোবর সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন নাভানা সিটি এলাকা থেকে ডিবি পুলিশ তাঁকে আটক করে। এ সময় প্রায় ১৪ ঘণ্টা তাঁকে নির্যাতন ও হুমকির মুখে থাকতে হয়েছিল বলে তিনি অভিযোগ করেন। ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের হামলায় তিনি আহত হন বলেও উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া ২০২৩ সালের ২ নভেম্বর রাতে পুলিশ তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে রাজনীতি থেকে সরে আসার হুমকি দেয় এবং বাড়ির বিভিন্ন জিনিসপত্র ভাঙচুর করে বলে তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
পারিবারিকভাবেও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা
রাকিবুর রহমান সাগরের রাজনৈতিক পথচলার পেছনে রয়েছে তাঁর পরিবারের দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাস। তাঁর বাবা আবুল কাশেম, মা রেজিয়া বেগম এবং চাচা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
সাগরের দাদা প্রয়াত তাইজুদ্দিন আহমেদের হাত ধরে তাঁর বাবা আবুল কাশেম আশির দশকে শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। তিনি আদমজী জুট মিল ইউনাইটেড এমপ্লয়িজের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তাঁর সক্রিয় ভূমিকা ছিল। ১৯৯১ সালে নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজুল ইসলাম কমান্ডারের মাধ্যমে তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন।
পরবর্তী সময়ে তিনি সুমিলপাড় ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি এবং সিদ্ধিরগঞ্জ থানা বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি আদমজী জুট মিলের জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ৩২টি মামলা হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার পর ২০০৪ সালের ২৬ মার্চ তিনি নৃশংস হামলার শিকার হয়ে নিহত হন বলে পারিবারিক সূত্রে জানা যায়।
বাবার মৃত্যুর পরও রাকিবুর রহমান সাগরের মা রেজিয়া বেগম বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। বিএনপির দলীয় পতাকা হাতে বিভিন্ন সমাবেশ ও রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁকে অংশ নিতে দেখা গেছে। পরবর্তী সময়ে সিদ্ধিরগঞ্জ পৌরসভা গঠনের পর তিনি পৌর প্রশাসকের সহায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একই সঙ্গে সিদ্ধিরগঞ্জ থানাধীন ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
সাগরের চাচাও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পারিবারিক সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার কারণে তাঁর চাচার বিরুদ্ধেও ১১টি রাজনৈতিক মামলা করা হয়েছিল। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর তাঁকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল বলেও পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
যুবদলের নতুন কমিটিতে আলোচনায় সাগরের নাম
এদিকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর যুবদলের সম্ভাব্য নতুন কমিটি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। এ কমিটিতে সভাপতি পদপ্রত্যাশী হিসেবে অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগরের নামও আলোচনায় রয়েছে বলে তাঁর অনুসারীরা জানিয়েছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে মিথ্যা তথ্য ও গুজব ছড়ানো হচ্ছে বলে তাঁর অনুসারীদের অভিযোগ। তাঁদের দাবি, রাজনৈতিকভাবে তাঁকে চাপে রাখা এবং তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার উদ্দেশ্যে একটি মহল পরিকল্পিতভাবে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, আন্দোলন-সংগ্রামে অংশগ্রহণ, মামলা ও বিভিন্ন প্রতিকূলতার অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তাঁর অনুসারীরা মনে করেন, বিএনপির রাজনীতিতে তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। তাঁদের মতে, তৃণমূলের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত নেতাদের দায়িত্বশীল অবস্থানে মূল্যায়ন করা হলে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হতে পারে।
নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে অ্যাডভোকেট রাকিবুর রহমান সাগরের দীর্ঘ রাজনৈতিক পথচলা, পারিবারিক রাজনৈতিক ইতিহাস এবং আসন্ন মহানগর যুবদলের কমিটিতে তাঁর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।