মোঃআনজার শাহ
নগর মানে কেবল কংক্রিটের স্তূপ নয়, মানুষের স্বপ্ন, স্বস্তি আর নিরাপদ জীবনের ঠিকানা। সেই ঠিকানাকে পরিকল্পিত, নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব করে গড়ে তুলতে আবাসন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও যাতায়াতব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি বলেন, নগর উন্নয়ন মানে শুধু উঁচু উঁচু ভবন নির্মাণ বা আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণ নয়; মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাও এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
রোববার (১১ অক্টোবর) রাজধানীতে বাংলাদেশ আর্কিটেক্টস ইনস্টিটিউট (বিএআই) আয়োজিত ‘আর্চ সামিট ২০২৬, বাংলাদেশ’-এর মেয়র সম্মেলনে বক্তব্য দিতে গিয়ে মন্ত্রী এসব কথা বলেন। এবারের সম্মেলনের প্রতিপাদ্য ‘কোলাবোরেটিং সিটিজ’ (Collaborating Cities), যার মূল ভাবনা নগর উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতা, সমন্বয় ও সম্মিলিত উদ্যোগ। অনুষ্ঠানে দেশি-বিদেশি মেয়র, নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান, বিএআইয়ের নেতৃবৃন্দ, স্থপতি, আমন্ত্রিত অতিথি ও সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন।
মন্ত্রী বলেন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও উন্নত নাগরিক সুবিধার আশায় মানুষ প্রতিনিয়ত শহরমুখী হচ্ছে। ফলে ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে জনসংখ্যার চাপ ক্রমেই বাড়ছে। দ্রুত নগরায়ণের এ বাস্তবতায় নগর পরিকল্পনাকে হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি, জনবান্ধব ও বাস্তবতানির্ভর। মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পাশাপাশি যাতায়াত, আবাসন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করাই এখন অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ।
অপরিকল্পিত নগরায়ণ রোধে শুধু ভবন নির্মাণ ও আবাসিক এলাকা সম্প্রসারণে নজর দিলে চলবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, নগরের প্রাণ ফিরিয়ে আনতে পর্যাপ্ত খেলার মাঠ, জলাধার, উন্মুক্ত স্থান, সবুজ এলাকা ও বিনোদনকেন্দ্র সংরক্ষণ করতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংস করলে তার বিরূপ প্রভাব শেষ পর্যন্ত নগরবাসীর জীবনেই ফিরে আসবে। তাই প্রতিটি পদক্ষেপে নাগরিক স্বাচ্ছন্দ্য ও পরিবেশগত ভারসাম্যকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
নগরকে পরিকল্পিতভাবে গড়তে কোনো একক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোগ যথেষ্ট নয় বলে মন্তব্য করেন মন্ত্রী। তিনি বলেন, স্থানীয় উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, সিটি করপোরেশন এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠার পাশাপাশি ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ কমানো সম্ভব হবে।
তিনি জানান, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীন নগর উন্নয়ন অধিদপ্তর বিভিন্ন নগর ও এলাকায় মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ করছে। এসব মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য নির্দিষ্ট নীতিমালার আওতায় আবাসিক এলাকা, শিল্প ও বাণিজ্যিক অঞ্চল, জলাশয় এবং বিনোদনমূলক স্থান চিহ্নিত করে একটি টেকসই ও সুশৃঙ্খল নগরায়ণব্যবস্থা গড়ে তোলা। পরিকল্পিত ভূমি ব্যবহার নিশ্চিত হলে অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ কমবে এবং নাগরিক সুবিধার সুষম বণ্টনের পথ সুগম হবে।
স্থপতিদের দায়িত্ব: দেশের মাটি ও জলবায়ুর সঙ্গে সংগতি
ভবিষ্যৎ নগরায়ণে স্থপতিদের ভূমিকার ওপর বিশেষ জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, একজন স্থপতি শুধু একটি ভবনের নকশা করেন না; তাঁর নকশা একটি পরিবারের জীবনযাপন, একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম এবং একটি এলাকার ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করে। তাঁদের সৃজনশীলতা, পেশাগত দক্ষতা ও দূরদর্শী পরিকল্পনা নগর উন্নয়নকে আরও মানবিক ও টেকসই করে তুলতে পারে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জলবায়ুগত বাস্তবতার সঙ্গে সংগতি রেখে স্থাপত্যচর্চার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, দেশের আবহাওয়া, অতিবৃষ্টি, আর্দ্রতা, বন্যা এবং অঞ্চলভেদে ভিন্ন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তাই অন্য দেশের স্থাপত্যশৈলী অনুকরণ করলেই চলবে না। আধুনিক স্থাপত্যের সঙ্গে স্থানীয় পরিবেশ ও মানুষের জীবনযাত্রার সামঞ্জস্য বজায় রাখাই হওয়া উচিত স্থাপত্যচর্চার অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
মন্ত্রী আরও বলেন, ভবন নির্মাণে শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য বিবেচনা করলে হবে না। ভবনটি কতটা পরিবেশবান্ধব, কতটুকু বিদ্যুৎ ও পানি ব্যবহার করছে, প্রাকৃতিক আলো-বাতাসের সর্বোত্তম ব্যবহার হচ্ছে কি না এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে কতটা কার্যকর এসব বিষয়ও গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। একই সঙ্গে অগ্নিনিরাপত্তা, ভূমিকম্প সহনশীলতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় ভবনের সক্ষমতা নিশ্চিত করার ওপরও জোর দেন তিনি। তাঁর মতে, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব স্থাপত্য নিশ্চিত করা গেলে নগরবাসীর জীবন ও সম্পদের সুরক্ষা বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য আরও বাসযোগ্য নগর গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
নগর উন্নয়নকে কেবল অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের জীবনমান, পরিবেশ সংরক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চাহিদার সঙ্গে সমন্বিত করার আহ্বান জানান গৃহায়ণমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকার, নগর কর্তৃপক্ষ, স্থপতি ও সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগেই একটি আধুনিক, নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।