মোহাম্মদ আবদুস সাত্তার শিল্পু:
পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী ইউনিয়নের কুলনিয়া গ্রামে ১০ বছরের শিশু মোছা. কামরুন্নাহার কলি হত্যা মামলার মূল রহস্য উদঘাটনের দাবি করেছে পাবনা জেলা পুলিশ। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে মোস্তফা কামাল (৫৫) ও মো. ইয়াছিন আলী (২১) নামে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকালে স্থানীয়দের দেওয়া খবরের ভিত্তিতে বাড়ির পাশের একটি ডোবা থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় শিশু কামরুন্নাহার কলির মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ সময় মরদেহ ডুবিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে বস্তার ভেতরে বাঁধা ইটসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত জব্দ করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় পাবনা সদর থানাধীন দোগাছী ইউনিয়নের কুলনিয়া গ্রামের কামাল প্রামাণিকের মেয়ে শিশু কামরুন্নাহার কলি (১০) নিখোঁজ হয়। পরে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্তের ধারাবাহিকতায় পুলিশ ঘটনাটির সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার দিন আসামি মোস্তফা ও ইয়াছিন প্রলোভন দেখিয়ে শিশু কলিকে মোস্তফার মুদি দোকানের পেছনের শয়নকক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে তাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। শিশু কলি প্রতিবেশী হওয়ায় বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার আশঙ্কায় আসামিরা তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় বলে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশ জানায়, এরপর আসামিরা শ্বাসরোধ করে শিশু কলির মৃত্যু নিশ্চিত করে। হত্যার পর মরদেহ গুম করার উদ্দেশ্যে মোস্তফার দোকানে থাকা হলুদ রঙের প্লাস্টিকের বস্তার ভেতর মরদেহ ঢুকিয়ে তার ঘরের খাটের নিচে একদিন লুকিয়ে রাখা হয়।
পরদিন রাতে ওই মরদেহভর্তি হলুদ বস্তাটি একটি সাদা প্লাস্টিকের বস্তার ভেতরে ঢোকানো হয়। এরপর বস্তার সঙ্গে দুটি ইট বেঁধে মোস্তফার টিনশেড বাড়ির পাশে একটি পরিত্যক্ত ডোবার ঝোপঝাড় ও লতাপাতার নিচে পানিতে ডুবিয়ে রাখা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের আরও ভাষ্য, পরবর্তীতে এলাকাবাসী মানববন্ধনসহ প্রত্যেকের বাড়ি তল্লাশির ঘোষণা দিলে গত মঙ্গলবার রাত আনুমানিক ৪টার দিকে আসামিরা বস্তাবন্দি মরদেহটি পানির নিচ থেকে তুলে অন্যত্র সরানোর চেষ্টা করে। এ সময় মরদেহটি সেফটি ট্যাংকের পাশে নিয়ে আসা হয়। পরে লাশের অতিরিক্ত দুর্গন্ধ ও কুকুরের ডাক শুনে আসামিরা ভয় পেয়ে মরদেহভর্তি বস্তাটি সেফটি ট্যাংকের পাশে রেখে পালিয়ে যায়।
তদন্তকালে গ্রেপ্তারকৃত আসামি মোস্তফা কামালের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন পর্যালোচনা করে গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, ঘটনার দিন ৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টা ৫২ মিনিটের দিকে শিশু কামরুন্নাহার কলি তার ছোট ভাইকে সঙ্গে নিয়ে মোস্তফার মুদি দোকানে জিনিস কিনতে যায়।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় মোস্তফা নিজের মোবাইল ফোন দিয়ে শিশু কলির একাধিক ছবি গোপনে ধারণ করে। পরে ছবিগুলো ডিলিট করে দেওয়া হলেও তদন্তে সেগুলো সফলভাবে পুনরুদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশ এই ডিজিটাল আলামতকে মামলায় আসামির অপরাধের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতি ও পূর্বপরিকল্পনার প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
ঘটনার সার্বিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে মামলাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে তদন্তভার পাবনা জেলার গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। ডিবি পাবনা দ্রুততম সময়ে আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে বস্তুনিষ্ঠ অভিযোগপত্র দাখিল নিশ্চিত করবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
গ্রেপ্তারকৃত আসামিদের আরও নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পুলিশ রিমান্ডের আবেদন করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—মো. মোস্তফা কামাল (৫৫), পিতা- মৃত আঃ মতিন প্রাং, মাতা- মোছা. হালিমা বেগম, সাং- কুলনিয়া ৮ নম্বর ওয়ার্ড, দোগাছী, থানা ও জেলা- পাবনা।
অপরজন মো. ইয়াছিন আলী (২১), পিতা- মৃত মোহাব্বত আলী, মাতা- মৃত নুর নাহার বেগম। তার স্থায়ী ঠিকানা সুবর্ণসারা (ঈদগাহ মাঠের সামনে), থানা- বেলকুচি, জেলা- সিরাজগঞ্জ এবং বর্তমান ঠিকানা কুলনিয়া ৮ নম্বর ওয়ার্ড, দোগাছী, থানা ও জেলা- পাবনা।
পাবনা জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মামলাটির তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।