মোঃ আনজার শাহ:
বরুড়ার লক্ষ্মীপুর মাঠ শুধু একটি পথসভার মাঠ নয়; এটি যেন হয়ে উঠেছে কুমিল্লাবাসীর দীর্ঘ লালিত স্বপ্ন আর প্রাণের দাবির এক মহামিলনক্ষেত্র। হাজারো মানুষের উত্তাল জনসমুদ্রের মাঝে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সামনে বসিয়ে একের পর এক জোরালো দাবি উত্থাপন করলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী এবং কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের (এমপি)। কুমিল্লার নামে পূর্ণাঙ্গ বিভাগ ঘোষণা, একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং জরাজীর্ণ সদর হাসপাতালকে ৩০০ শয্যায় উন্নীত করার দাবিতে আজ বজ্রকণ্ঠ হলেন এই মন্ত্রী। আজ শনিবার (১৬ মে ২০২৬) সকালে বরুড়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর খেলার মাঠে আয়োজিত ঐতিহাসিক পথসভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এই দাবিগুলো তুলে ধরেন।
‘কুমিল্লা’ নামেই বিভাগ চাই, অন্য কোনো নামে নয়
বিভাগের প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নিয়ে গৃহায়ন মন্ত্রী বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি জেনে আনন্দিত হবেন—কুমিল্লার মানুষ বহু আগেই একটি পূর্ণাঙ্গ বিভাগ পাওয়ার সকল যোগ্যতা অর্জন করেছে।” তিনি বলেন, পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকার কুমিল্লা বিভাগ ঘোষণার সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেনি। শুধু তাই নয়, এই বিভাগের নাম রাখতে চেয়েছিল ‘তিতাস’—যা কুমিল্লার আত্মাভিমানী মানুষ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। সেই প্রত্যাখ্যানের পরিণতিতে আজও কুমিল্লার মানুষ বিভাগ থেকে বঞ্চিত।
দৃঢ় ও উচ্চকণ্ঠে মন্ত্রী ঘোষণা দেন, “আমরা ‘কুমিল্লা’ নামেই বিভাগ চাই। এই নামের সঙ্গে আমাদের ইতিহাস, আমাদের ঐতিহ্য, আমাদের অস্তিত্ব জড়িয়ে আছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার হাত ধরেই কুমিল্লার এই দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটবে—এই বিশ্বাস আমাদের প্রতিটি মানুষের বুকে অটল হয়ে আছে।”
‘বেগম খালেদা জিয়ার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন আজ পূরণ করুন’
কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি তুলে ধরে মন্ত্রী আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আমাদের বরুড়াসহ কুমিল্লার এই বিস্তীর্ণ অঞ্চল মূলত একটি কৃষিনির্ভর জনপদ। এই মাটির মানুষ কৃষিকে ভালোবাসে, কৃষিকে আঁকড়ে বেঁচে থাকে। তাই এখানে একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের অনিবার্য দাবি।”
গৌরবময় অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “২০০১ সালে বাংলাদেশের কান্ডারি মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর কুমিল্লাবাসীকে একটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় এবং ৫০০ শয্যার আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল উপহার দিয়েছিলেন। সেই সময় থেকেই কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বপ্নটি কুমিল্লার মানুষের মনে দানা বাঁধতে শুরু করেছিল। আজ, এই মাহেন্দ্রক্ষণে আপনার মাধ্যমে সেই অসম্পূর্ণ স্বপ্ন পূরণের প্রত্যাশায় বুক বেঁধে আছে গোটা কুমিল্লা।”
‘জরাজীর্ণ হাসপাতালে লাখো মানুষের কষ্ট—একটু মনোযোগ দিন’
কুমিল্লা সদর হাসপাতালের দুঃখজনক বাস্তবতা তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আরও একটি ছোট্ট কিন্তু অত্যন্ত জরুরি আবেদন জানাতে চাই। কুমিল্লা শহরের একদম প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা সদর হাসপাতালটি আজ ভগ্নপ্রায় ও জরাজীর্ণ অবস্থায় কোনোমতে টিকে আছে। মাত্র ১৩০ শয্যার এই ক্ষুদ্র হাসপাতালে প্রতিদিন শত শত অসহায় রোগী চিকিৎসাসেবার আশায় ভিড় করেন। অথচ পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধার অভাবে তাঁরা বারবার হতাশ হয়ে ফিরে যান।”
আর্তিজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আপনি যদি এই হাসপাতালটিকে আড়াইশো থেকে তিনশো শয্যার একটি আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ হাসপাতালে রূপান্তরিত করেন, তাহলে কুমিল্লা শহরের লাখো সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিনের কষ্ট থেকে মুক্তি পাবেন। বাকি সিদ্ধান্ত আপনার বিবেচনা ও উদারতার ওপর সানন্দে ছেড়ে দিলাম, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।”
কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় শেষ—তারপর বজ্রনির্ঘোষ স্লোগান
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে গভীর কৃতজ্ঞতা ও আবেগ নিয়ে মন্ত্রী বলেন, “আমাদের প্রিয় নেতা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান—আপনি ব্যস্ততার মাঝেও বরুড়ার মাটিতে এসেছেন, এই জনপদের মানুষের কথা শুনতে সময় দিয়েছেন। এর জন্য আপনাকে কুমিল্লাবাসীর পক্ষ থেকে অসংখ্য ধন্যবাদ ও আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই।” পুরো কুমিল্লা জেলার প্রতিটি প্রান্ত থেকে ছুটে আসা সকল নেতাকর্মী ও সমর্থকদেরও আন্তরিক ধন্যবাদ ও অভিনন্দন জানান তিনি।
এরপর উপস্থিত হাজারো মানুষের সঙ্গে একত্রে কণ্ঠ মিলিয়ে বজ্রনির্ঘোষ স্বরে স্লোগান দিয়ে বক্তব্যের সমাপ্তি টানেন গৃহায়ন মন্ত্রী—”বাংলাদেশ জিন্দাবাদ!” “বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল জিন্দাবাদ!” “শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান জিন্দাবাদ!” “বেগম খালেদা জিয়া জিন্দাবাদ!” “মোহাম্মদ তারেক রহমান জিন্দাবাদ!”
স্লোগানের সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ্মীপুর মাঠ যেন কেঁপে ওঠে হাজারো কণ্ঠের বজ্রগর্জনে। উপস্থিত জনতার উচ্ছ্বাস, আবেগ আর ভালোবাসার ঢেউয়ে ভেসে যায় বরুড়ার এই ঐতিহাসিক মাঠ। ইতিহাসের পাতায় চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে আজকের এই অবিস্মরণীয় মুহূর্ত।