বরগুনায় বেড়েছে বিদ্যুতের সার্ভিস তার চুরি, ভোগান্তিতে শতাধিক গ্রাহক

জেলা প্রতিনিধি:

বরগুনায় হঠাৎ করে বেড়েছে গ্রাহকদের বৈদ্যুতিক সার্ভিস তার চুরির ঘটনা। গত দুই মাসে অন্তত শতাধিক বাড়ির মূল্যবান সার্ভিস তার চুরি হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। একই সময়ে বরগুনা পৌর বর্জ্য শোধনাগারের অধিকাংশ লাইট পোস্টের তারও চুরি হয়েছে।

জেলা পুলিশ জানিয়েছে, সার্ভিস তার চুরির সঙ্গে জড়িত একটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। ইতোমধ্যে চক্রটির একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং আরও কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। অন্য সদস্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।

বরগুনা সদর উপজেলার পিটিআই-সংলগ্ন ক্রোক এলাকার বাসিন্দা মোর্শেদা বেগম স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ছোট চায়ের দোকান পরিচালনা করে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রায় দুই সপ্তাহ আগে রাতে তার দোকানের আনুমানিক ২০ হাজার টাকা মূল্যের বৈদ্যুতিক সার্ভিস তার চুরি হয়ে যায়।

এরপর থেকে দোকানটি বিদ্যুৎবিহীন। আর্থিক সংকটের কারণে নতুন করে সার্ভিস তার কিনে সংযোগ নিতে পারছেন না মোর্শেদা। ফলে রাতে দোকান অন্ধকারে থাকে। তীব্র গরমে ফ্যান চালাতে না পারায় ক্রেতাও কমেছে। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক কেটলি ব্যবহার করতে না পারায় চা তৈরিতেও সমস্যায় পড়েছেন তিনি।

মোর্শেদা বেগম বলেন, স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে চায়ের দোকান করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। অনেক কষ্টে সার্ভিস তার কিনে দোকানে বিদ্যুৎ সংযোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু রাতে সেই তার চুরি হয়ে যাওয়ায় আর্থিক সংকটের কারণে নতুন তার কিনতে পারছেন না। বিদ্যুৎ না থাকায় দোকানের বেচাকেনাও কমে গেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, শুধু মোর্শেদার দোকান নয়, ওই এলাকার আরও অনেক বাড়ির সার্ভিস তার রাতের আঁধারে চুরি হয়েছে। ফলে প্রতিনিয়ত চুরির আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে তাদের। সার্ভিস তার চুরি হওয়ার পর পুনরায় সংযোগ নিতে নিজেদের অর্থেই নতুন তার কিনতে হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, দূরত্ব অনুযায়ী নতুন সার্ভিস তার কিনতে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ হচ্ছে। প্রতিগজ সার্ভিস তারের দাম ২২০ থেকে ৩০০ টাকা পর্যন্ত হওয়ায় অনেকের জন্য এ ব্যয় বহন করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরেজমিনে পিটিআই-সংলগ্ন ক্রোক এলাকায় দেখা যায়, মোর্শেদার ছোট চায়ের দোকানটি বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়াই চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, গত দুই মাসে এলাকায় অন্তত শতাধিক গ্রাহকের সার্ভিস তার চুরি হয়েছে। চোরেরা তারের প্লাস্টিকের আবরণ খুলে তামার অংশ নিয়ে যাচ্ছে। পরে খোসাগুলো বিভিন্ন সড়কের পাশে ও ঝোপঝাড়ে ফেলে রাখা হচ্ছে।

পিটিআই-সংলগ্ন হেউলিবুনিয়া এলাকায় নির্মিত বরগুনা পৌরসভার বর্জ্য শোধনাগারেও একই ধরনের চুরির ঘটনা ঘটেছে। সেখানকার ভেতর ও বাইরের অধিকাংশ লাইট পোস্টের সংযোগ তার চুরি হওয়ায় রাত হলেই পুরো এলাকা অন্ধকার হয়ে যায়। এতে সেখানে কর্মরতদেরও ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।

বর্জ্য শোধনাগারের কর্মী সোবহান বলেন, লাইট পোস্ট আছে, কিন্তু তার নেই। সব তার চুরি হয়ে গেছে। বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা না হওয়ায় রাতে অন্ধকারে থাকতে হচ্ছে।

আরেক কর্মী মো. ফারুক বলেন, সব তার কেটে নিয়ে যাওয়ায় সেখানে কাজ করতে ও রাতে থাকতে সমস্যা হচ্ছে। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ বিষয়টি দেখে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে জানান তিনি।

ক্রোক এলাকার বাসিন্দা মো. সোহেল বলেন, রাত হলেই বিভিন্ন বাড়ির সার্ভিস তার চুরি হচ্ছে। একের পর এক চুরির ঘটনা ঘটলেও স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন কোনো ভূমিকা দেখা যাচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, এলাকার অনেকের ঘরের সার্ভিস তার চুরি হয়েছে। রাতে ঘুম থেকে উঠে সকালে দেখা যায়, সংযোগের তার নেই। চোরদের কাছে দেশীয় অস্ত্র থাকায় অনেকে বাধা দেওয়ার সাহসও পান না।

সম্প্রতি নিজের বাড়ির সার্ভিস তার চুরির ঘটনা তুলে ধরে মো. উজ্জ্বল বলেন, বাজার থেকে বাড়িতে ফিরে বিদ্যুৎ না পেয়ে খাম্বার কাছে গিয়ে দেখেন সংযোগ তার কাটা। পরে খোঁজ করতে গিয়ে এলাকার ছাড়া বাড়ি নামের একটি জায়গায় কয়েকজনকে তার কাটতে দেখেন। অন্ধকারে তাদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করে কাটা অবস্থায় নিজের তারটি নিয়ে আসেন। ওই ব্যক্তিদের কাছে চাকু ছিল বলেও জানান তিনি।

বরগুনা জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মুকিত হাসান খাঁন বলেন, জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযান চলছে। এর ধারাবাহিকতায় চোর, ডাকাত ও মাদকসেবীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সার্ভিস তার চুরির একটি চক্র সক্রিয় হওয়ার খবর পুলিশের নজরে এসেছে।

তিনি জানান, ইতোমধ্যে ওই চক্রের একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। চক্রের অন্য সদস্যদেরও শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে কার্যক্রম চলছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *