স্টাফ রিপোর্টার:
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য দপ্তরের সুরক্ষিত কম্পাউন্ডে ঘটে গেল অবিশ্বাস্য এক ঘটনা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতিতেই কয়েকশ নারী-পুরুষ মিলে সরকারি জব্দকৃত বিপুল পরিমাণ জাটকা মাছ লুট করে নিয়ে গেছে। ঘটনাটি ঘটেছে শুক্রবার গভীর রাতে, বরিশাল নগরীর সিঅ্যান্ডবি রোড এলাকায় অবস্থিত জেলা মৎস্য দপ্তরের প্রাঙ্গণে।
বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তরের সহকারী পরিচালক আলী হাসান বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “রাতে আমরা কুয়াকাটা থেকে ঢাকাগামী কিংস পরিবহনের একটি বাসে পাচারকৃত জাটকা মাছ আটক করি। পরে বাসটি থেকে ১৬টি কার্টুন ভর্তি জাটকা মাছ উদ্ধার করে আমাদের অফিসে নিয়ে আসা হয়। পরদিন সকালে বিভিন্ন এতিমখানা, মাদ্রাসা ও শিশু সদনে বিতরণের জন্য মাছগুলো রাখা হয়েছিল। কিন্তু মাঝরাতে কয়েকশ নারী-পুরুষ হঠাৎ দপ্তরের ভেতরে ঢুকে পড়ে সব মাছ লুট করে নিয়ে যায়।”
জাটকা পাচার রোধে অভিযানের পরই লুটের ঘটনা
ঘটনার সূত্রপাত কুয়াকাটা উপকূলে। শুক্রবার রাতে গোপন সূত্রে খবর পেয়ে মৎস্য দপ্তরের কর্মকর্তারা জানতে পারেন, কুয়াকাটার আলীপুর-মহিপুর মৎস্য বন্দরের একটি চক্র বিপুল পরিমাণ জাটকা ঢাকায় পাচার করছে। খবর পেয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় নগরীর প্রবেশপথে অবস্থান নেন। রাত আনুমানিক ১১টার দিকে কুয়াকাটা থেকে আসা কিংস পরিবহনের একটি বাস থামিয়ে তল্লাশি চালানো হয়।
তল্লাশিতে বাসের নিচের লোকারে পাওয়া যায় ১৬টি কার্টুন ভর্তি জাটকা—যার প্রতিটি কার্টুনে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কেজি করে মাছ ছিল। উদ্ধারকৃত মাছগুলো বরিশাল জেলা মৎস্য দপ্তরের কম্পাউন্ডে নিয়ে রাখা হয়।
সহকারী পরিচালক আলী হাসান বলেন, “আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, এসব মাছ পরদিন সকালে নগরীর এতিমখানা, মাদ্রাসা, শিশু সদন ও দরিদ্র মানুষের মাঝে বিতরণ করা হবে। এজন্য প্রায় ৩০টি প্রতিষ্ঠানে বার্তা পাঠানো হয়।”
হঠাৎই মব তৈরি হয়ে পড়ে সবাই
কিন্তু পরিস্থিতি বদলে যায় মধ্যরাতের পর। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রাত প্রায় ১২টার দিকে হঠাৎই আশপাশের এলাকা থেকে শত শত নারী, পুরুষ ও শিশুরা মৎস্য দপ্তরের সামনে জড়ো হতে থাকে। কেউ বলছিল, “বিনামূল্যে মাছ দেওয়া হচ্ছে”—এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তের মধ্যেই।
প্রত্যক্ষদর্শী আল আমিন বলেন, “ভিতরে তখন মৎস্য অফিসের লোকজন, কয়েকটি মাদ্রাসার প্রতিনিধি, আনসার সদস্য ও কিছু সাংবাদিক ছিল। তারা বিতরণের জন্য কিছু কার্টুন খুলছিল। হঠাৎ গেট খোলা হলে বাইরে থাকা মানুষজন হুড়োহুড়ি করে ভেতরে ঢুকে পড়ে। এরপর সবাই ব্যাগ, ঝুড়ি, এমনকি শাড়ির আঁচলে পর্যন্ত মাছ ভরে নিয়ে যায়।”
চোখের সামনে যা ঘটছে, তা কেউ ঠেকাতে পারেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা লাঠিপেটা করে জনতাকে সরানোর চেষ্টা করলেও ব্যর্থ হন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই ১৫টি কার্টুন ভর্তি জাটকা গায়েব হয়ে যায়।
পাচার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ক্ষোভ
এ ঘটনার পর থেকেই জাটকা পাচারকারী সিন্ডিকেট নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বরিশালের এক প্রভাবশালী মৎস্য ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কুয়াকাটার আলীপুর ও মহিপুর মৎস্য বন্দর থেকে প্রায় প্রতিদিনই জাটকা ঢাকায় পাচার হয়। এই কাজে কয়েকজন ব্যবসায়ী এবং পরিবহন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জড়িত। তারা নিয়মিত দপ্তরগুলিকে টাকা দেয়—তবেই বাসে জাটকা তোলা হয়।”
তার ভাষায়, “শুক্রবার ধরা পড়া জাটকার বাজারমূল্য অন্তত পাঁচ লাখ টাকা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই মাছগুলো উদ্ধার হওয়ার পরও গরিবের হাতে বিতরণ না হয়ে লুটের শিকার হলো।”
প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন—রাতের বেলা সরকারি অফিসের ভেতর এত বড় লুটের ঘটনা ঘটল, অথচ সেখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়নি কেন? স্থানীয়দের অভিযোগ, “অফিস প্রাঙ্গণে আনসার সদস্য ও পুলিশ উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তারা তেমন ব্যবস্থা নেয়নি।”
একজন প্রত্যক্ষদর্শী নারী বলেন, “আমরা দেখেছি, লোকজন দৌড়ে দৌড়ে মাছ নিচ্ছে। কেউ থামায়নি। সবাই বলছিল—সরকার নাকি গরিবের জন্য মাছ দিচ্ছে!”
ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওতে দেখা গেছে, শত শত নারী, পুরুষ ও শিশু অফিস প্রাঙ্গণে ঢুকে পড়েছে। কেউ ব্যাগে, কেউ ঝুড়িতে, কেউবা কাপড়ে মাছ ভরছে। কেউ কেউ হাসতে হাসতে বলছে—‘আজ খাইতে পারব ভালো মাছ।’
লুট হওয়া মাছ উদ্ধার হয়নি, তদন্ত শুরু
সহকারী পরিচালক আলী হাসান জানান, ঘটনার পর তাৎক্ষণিকভাবে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত লুট হওয়া মাছের কোনো অংশ উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, “এ ঘটনায় অভ্যন্তরীণ তদন্ত শুরু হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি ভিডিও ফুটেজ দেখে সংশ্লিষ্টদের শনাক্ত করতে।”
জেলা প্রশাসনের এক কর্মকর্তা বলেন, “এই ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক। উদ্ধারকৃত সরকারি সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্ব সবার আগে প্রশাসনের। আমরা বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করছি।”
উপকূলে বাড়ছে জাটকা পাচার
মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতি বছর নিষিদ্ধ মৌসুমেও বিপুল পরিমাণ জাটকা ধরা ও পাচার হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলে। বিশেষ করে আলীপুর, মহিপুর, আন্ধারমানিক নদী ও কুয়াকাটা উপকূল থেকে প্রতিদিন শত শত কেজি জাটকা ঢাকাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে পাচার হয়।
একাধিক সূত্র জানায়, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনীতিকদের ছত্রছায়ায় এই সিন্ডিকেটগুলো সক্রিয় রয়েছে। প্রশাসনের অভিযান সাময়িক হলেও, কিছুদিন পর আবারও পুরনো চক্র সক্রিয় হয়ে পড়ে।
জনমনে ক্ষোভ
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। কেউ বলছেন, “এটা গরিবের ক্ষুধার প্রতিচ্ছবি”—আবার কেউ লিখেছেন, “এটা প্রশাসনিক ব্যর্থতার চূড়ান্ত নিদর্শন।”
বরিশালের প্রবীণ নাগরিক নূরুল আমিন বলেন, “সরকারি দপ্তরের ভেতরে এভাবে মানুষ ঢুকে লুট করবে, এটা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনাও করা যায় না। প্রশাসন যদি সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করত, তাহলে মাছ গরিবদের কাছেই পৌঁছাত, লুটেরাদের হাতে নয়।”
উপসংহার:
বরিশালের এই ঘটনায় একদিকে যেমন প্রশাসনের নিরাপত্তা দুর্বলতা প্রকাশ পেয়েছে, তেমনি চরম দারিদ্র্য ও জনঅসন্তোষের চিত্রও ফুটে উঠেছে। উদ্ধারকৃত মাছ বিতরণের আগে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি ‘লুট’ নয়—এটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের অব্যবস্থাপনা ও জনগণের আস্থাহীনতার প্রতীকও বটে।