বরুড়ায় মুকুন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাদ ধসে বিপর্যস্ত পাঠদান, ঝুঁকিতে শত শত শিশুর জীবন

 

মোঃ আনজার শাহ

বই-খাতার ভেতর যেখানে স্বপ্নের বীজ বোনার কথা, সেখানে ছাদের নিচে বসে প্রতিদিন মৃত্যুভয় গুনছে একদল কোমলমতি শিশু।
কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ২৬ নম্বর মুকুন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জরাজীর্ণ ভবনের ছাদ ও পলেস্তারা ধসে পড়ায় চরম ঝুঁকিতে পড়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনে বড় ধরনের ফাটল, ছাদের পলেস্তারা খসে পড়া এবং দেয়ালের বিভিন্ন অংশ ধসে যাওয়ার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এর পরও নিরাপদ শ্রেণিকক্ষের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় আতঙ্কের মধ্যেই চলছে পাঠদান। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা করছেন শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকেরা।

স্থানীয় সূত্র জানায়, বিদ্যালয়ের মূল ভবনের বিভিন্ন অংশ দীর্ঘদিন ধরেই জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। সম্প্রতি ভবনের একটি বড় অংশ ধসে পড়ে। সৌভাগ্যক্রমে ওই সময় শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছিল না; ফলে সম্ভাব্য প্রাণহানি থেকে রক্ষা পায় শিশুরা। তবে এমন বিপজ্জনক ঘটনার পরও শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বাধ্য হয়ে কখনো ঝুঁকিপূর্ণ বারান্দায়, আবার কখনো খোলা আকাশের নিচে পাঠদান কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে।

সরেজমিনে বিদ্যালয়টি পরিদর্শন করে দেখা যায়, মূল ভবনের ছাদের পলেস্তারা খসে পড়েছে। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। ভবনের পেছনের অংশে আস্তর ধসে পড়ায় দেয়ালের বেহাল অবস্থা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। শ্রেণিকক্ষের ছাদ দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ায় শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান যেখানে শিশুদের নিরাপদে বেড়ে ওঠা, জ্ঞান অর্জন ও ভবিষ্যৎ নির্মাণের ভিত্তি হওয়ার কথা, সেখানে ভবনের এমন বেহাল দশা শিক্ষার পরিবেশকে করে তুলেছে অনিরাপদ। শ্রেণিকক্ষে বসে পাঠ গ্রহণের পরিবর্তে শিশুদের প্রতিনিয়ত ভবন ধসের আশঙ্কা নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে।

বিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিন স্কুলে এলেও ভবনের অবস্থা নিয়ে তাদের মধ্যে ভয় কাজ করে। বৃষ্টি হলে ছাদ দিয়ে পানি পড়ে বই-খাতা ভিজে যায়। আকাশে মেঘ জমলে কিংবা বাতাস বেড়ে গেলে দুর্ঘটনার আশঙ্কায় অনেক সময় পাঠদান বন্ধ রাখতে হয়।
শিক্ষার্থীদের এই অনিশ্চয়তা শুধু নিয়মিত পড়াশোনাকেই ব্যাহত করছে না, বরং বিদ্যালয়ের প্রতি তাদের স্বাভাবিক আগ্রহ ও মানসিক স্বস্তিও নষ্ট করছে। নিরাপদ পরিবেশে শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে তাদের মধ্যে।

অভিভাবকদের ক্ষোভ, দুর্ঘটনার দায় নেবে কে?
সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় অভিভাবকেরা। তাঁদের ভাষ্য, সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো হয় শিক্ষা অর্জনের জন্য, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে শ্রেণিকক্ষে বসার জন্য নয়। ভবনের ছাদ ও পলেস্তারা ধসে পড়ার পরও নিরাপদ পাঠদানের ব্যবস্থা না হওয়ায় তাঁরা প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকেন।

অভিভাবকদের প্রশ্ন, একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবন এতটা ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ার পরও কেন দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না? কোনো বড় দুর্ঘটনায় শিশুরা হতাহত হলে তার দায়ভার কে নেবে?
তাঁদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কোনো দয়া বা অনুগ্রহের বিষয় নয়; এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মৌলিক দায়িত্ব। তাই আশ্বাসের পরিবর্তে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ চান তাঁরা।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ওমর ফারুক জানান, ফলাফলের দিক থেকে বিদ্যালয়টি বরাবরই ভালো করে আসছে। তিনি আরও জানান, জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬-এর নির্বাচনী ফলাফলে কুমিল্লা জেলা পর্যায়ে তিনি শ্রেষ্ঠ গুণী শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন। তবে বিদ্যালয়ের ভবনের বেহাল অবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, “বৃষ্টির সময় ছাদ দিয়ে পানি পড়ে। এতে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ভিজে যায়। পরিস্থিতি খারাপ হলে বাধ্য হয়ে ছুটি দিতে হয়। ছাদের পলেস্তারা ধসে শিশুদের গায়েও পড়েছে। এভাবে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
আবেগাপ্লুত কণ্ঠে প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, “অভিভাবকেরা তাঁদের সন্তানদের আমাদের কাছে আমানত হিসেবে পাঠান। সেই আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। কোনো দুর্ঘটনা ঘটে গেলে এর দায়ভার কে নেবে? আমি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী মহোদয়সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আকুল আবেদন জানাই, শিশুদের জীবন রক্ষা এবং নিরাপদ পরিবেশে পাঠদান নিশ্চিত করতে আমাদের বিদ্যালয়ের প্রতি বিশেষ দৃষ্টি দেওয়া হোক।”
প্রধান শিক্ষক জানান, বিদ্যালয়ের ভবনের বেহাল অবস্থা ও ধসে পড়ার বিষয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি বলে তাঁর অভিযোগ। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেই পাঠদান চালিয়ে যেতে হচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সমস্যাটি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় কাজ শুরু হবে।
তবে স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, একটি বিদ্যালয়ের ভবন ধসে পড়ার পরও নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করতে যদি বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকতে হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত হবে? ভবিষ্যতে বরাদ্দের অপেক্ষায় থেকে আরেকটি দুর্ঘটনার ঝুঁকি নেওয়া কতটা যুক্তিসংগত?
জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আশ্বাসের পাশাপাশি দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, প্রথমেই ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান বন্ধ করে বিকল্প নিরাপদ স্থানে শ্রেণিকক্ষের ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রকৌশলগত পরিদর্শনের মাধ্যমে ভবনটির প্রকৃত অবস্থা নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার অথবা নতুন ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নিতে হবে।

একদিকে শিক্ষার মানোন্নয়ন ও ঝরে পড়া রোধে নানা উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নিরাপদ শ্রেণিকক্ষের সংকটে পড়তে হচ্ছে এ বাস্তবতা উদ্বেগজনক। শিক্ষার ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেই ভিত্তি মজবুত করতে হলে পাঠ্যবই ও শিক্ষকের পাশাপাশি নিরাপদ অবকাঠামোও নিশ্চিত করা জরুরি।

মুকুন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের জীবন রক্ষা এবং স্বাভাবিক পাঠদান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন ও প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।

তাঁদের প্রত্যাশা, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনার পর নয়, বরং দুর্ঘটনা ঘটার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নেবে কর্তৃপক্ষ। একটি শিশুর জীবন ও ভবিষ্যৎ যেন অবহেলার কারণে বিপন্ন না হয়, সেই দায়িত্ববোধ থেকেই দ্রুত নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *