বিইউএফটি কেলেঙ্কারি: উচ্চশিক্ষার আড়ালে নৈতিক অবক্ষয়ের আঁতুড়ঘর কি এই ক্যাম্পাস?

এইচ এম হাকিম:

বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজি (বিইউএফটি) বর্তমানে এক নজিরবিহীন সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে উচ্চশিক্ষার মহান আদর্শ ও পবিত্রতা ভেঙে পড়ে সেখানে গড়ে উঠেছে অনিয়ম, অনৈতিকতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের এক ভয়ঙ্কর সংস্কৃতি। রাজধানীর উত্তরায় অবস্থিত এই স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটিকে ঘিরে সম্প্রতি যে ধরনের বিস্ফোরক তথ্য সামনে আসছে, তাতে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও নিরাপত্তার অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফ্যাশন ডিজাইন বিভাগের লেকচারার আফসানা মেহেরুন আইনিকে ঘিরে ওঠা একের পর এক গুরুতর অভিযোগ ক্যাম্পাসজুড়ে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে।

ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের দাবি অনুযায়ী, এই শিক্ষিকা একাডেমিক ফলাফলকে ব্যক্তিগত আক্রোশ মেটানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন, যেখানে তার অনুগত বা পছন্দের নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষার্থীকে অস্বাভাবিক একাডেমিক সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে এবং অন্যদিকে মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও অনেক শিক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃতভাবে কম নম্বর দিয়ে কিংবা ফলাফল আটকে রেখে তাদের ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ারকে অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে যে, সাবমিশন সংক্রান্ত কোনো যৌক্তিক জটিলতা নিয়ে যদি কোনো শিক্ষার্থী ডিন বরাবর লিখিত আবেদন করেন, তবে সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকা বিষয়টিকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করে সেই শিক্ষার্থীদের ওপর পরবর্তী সেমিস্টারগুলোতে ‘পানিশমেন্ট’ বা মানসিক হেনস্তার খড়গ নামিয়ে আনেন। তবে সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ও শিক্ষকতার মহান পেশাকে কলঙ্কিত করার মতো অভিযোগটি উঠেছে তার ছাত্রদের সাথে অস্বাভাবিক সখ্যতা ও ভ্রমণ নিয়ে; বিভিন্ন সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে যে, তিনি নির্দিষ্ট কিছু ছাত্রকে নিয়ে দেশের বিভিন্ন বিলাসবহুল রিসোর্ট ও পর্যটন এলাকায় প্রায়ই ভ্রমণে যান এবং সেইসব ভ্রমণের অতি ঘনিষ্ঠ ছবি নিজেই প্রচার করেন, যা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ন্যূনতম নৈতিক সীমানা অতিক্রম করেছে।

তার ব্যক্তিগত জীবনও বর্তমানে নানামুখী বিতর্কে জর্জরিত এবং স্বামীর সাথে দীর্ঘদিনের বিবাদ ও বিচ্ছেদের গুঞ্জন ক্যাম্পাসের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন আলমগীর হোসেন ১৮ জন শিক্ষার্থীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন এবং তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানালেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিস্ট্রার রফিকুজ্জামানের বক্তব্যে প্রশাসনিক সমন্বয়হীনতার নগ্ন রূপ ফুটে উঠেছে; তিনি জানিয়েছেন যে বিষয়টি সম্পর্কে তিনি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত নন। রেজিস্ট্রারের এই রহস্যজনক অজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মনে বড় ধরনের সন্দেহের সৃষ্টি করেছে যে, প্রশাসন কি তবে বিষয়টিকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে? বিইউএফটি-র এই নৈতিক স্খলন কেবল বর্তমানের কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের জমে থাকা এক বিষবৃক্ষ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন যে, অতীতেও এক সাবেক ডিনের বিরুদ্ধে একই ধরনের গুরুতর নারী কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ক্যাম্পাস উত্তাল হয়ে ওঠে এবং শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে কর্তৃপক্ষ তাকে চাকরিচ্যুত করতে বাধ্য হয়েছিল। আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে একটি সিন্ডিকেট তৈরি হয়েছে যারা নম্বরের ভয় দেখিয়ে কিংবা উচ্চ গ্রেডের প্রলোভন দিয়ে সাধারণ ছাত্রীদের ব্যক্তিগত সম্পর্কের দিকে ঠেলে দেয় এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের বিভিন্ন হোটেল ও রিসোর্টে নিয়ে যাওয়ার মতো পৈশাচিক ঘটনাও ঘটে চলেছে। এমন পরিস্থিতির নির্মম শিকার হয়ে অতীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী নিউমার্কেট এলাকায় রহস্যজনকভাবে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিলেন বলে জোরালো দাবি উঠেছে, যা নিয়ে নিউমার্কেট থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের হলেও পরবর্তীতে অদৃশ্য শক্তির ইশারায় সেই তদন্ত আর আলোর মুখ দেখেনি।

বর্তমানের অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হওয়া সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে এখনো নিয়মিত ক্লাস নেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে, যা ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি অংশ অভিযুক্তদের আড়াল করার জন্য ‘ম্যানেজ’ সংস্কৃতি চালু রেখেছে বলে শিক্ষার্থীরা সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন। সচেতন অভিভাবক মহল প্রশ্ন তুলেছেন, একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন দিনের পর দিন নৈতিক অবক্ষয়ের আঁতুড়ঘরে পরিণত হবে এবং কেন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও কঠোর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের এই দীর্ঘসূত্রতা? কেবল নৈতিক স্খলনই নয়, বিইউএফটি-র অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়েও চরম অসন্তোষ বিরাজ করছে; ক্যান্টিনের খাবারের চড়া মূল্য ও নিম্নমান, মেয়েদের হোস্টেলের অত্যধিক ভাড়া এবং ক্যাম্পাসের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অস্বাভাবিক দাম নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিগত দিনে ৭ দফা দাবিতে আন্দোলন করলেও তার কোনো স্থায়ী সমাধান হয়নি।

মূলত এই সমস্যাগুলোই এখন ইউনিভার্সিটির প্রচলিত নিয়মে পরিণত হয়েছে। এ বিষয়ে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটির রেজিস্ট্রারের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ১৮ জন শিক্ষার্থীর অভিযোগের বিষয়টি শুনেছেন বলে স্বীকার করেন এবং জানান যে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। একাডেমিক ক্ষমতার অপব্যবহার, ব্যক্তিগত জীবনের নৈতিক বিচ্যুতি এবং প্রশাসনের উদাসীনতা—এই তিনের সমন্বয়ে বিইউএফটি এখন এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত, যা নিরসনে অনতিবিলম্বে কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

শিক্ষার সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের মেধা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা। যদি দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই অনিয়ম ও অনৈতিকতার সংস্কৃতি বন্ধ করা না হয়, তবে বিইউএফটি-র মতো একটি প্রতিষ্ঠান তার সমস্ত গৌরব হারিয়ে ধ্বংসের মুখে পতিত হবে বলে শিক্ষাবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন। বর্তমানে ক্যাম্পাসে এক থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে এবং শিক্ষার্থীরা তাদের দাবি আদায়ে কঠোর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, যেখানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এখনো কোনো জোরালো ও গ্রহণযোগ্য সমাধান আসেনি…….চলবে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *