বিতর্ক পেছনে ফেলে শিল্পেই অমর মাইকেল জ্যাকসন

বিনোদন ডেস্ক:

আজ ২৯ আগস্ট, পপ সম্রাট মাইকেল জ্যাকসনের ৬৮তম জন্মদিন। ২০০৯ সালে পৃথিবী থেকে বিদায় নেওয়া এই কিংবদন্তি শিল্পী দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত। তবে তার গান, নাচ ও সৃষ্টিশীলতা এখনো বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে সমান জনপ্রিয়। মৃত্যুর পরও তাকে ঘিরে চলছে বিপুল ব্যবসা। ফোর্বসের হিসাবে, মৃত্যুর পর থেকে মাইকেল জ্যাকসনকে ঘিরে আয় হয়েছে প্রায় ৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার। শুধু ২০২৫ সালেই এ আয়ের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০৫ মিলিয়ন ডলার।

জন্মদিন উপলক্ষে মাইকেল জ্যাকসনের অফিশিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে জানানো হয়েছে, লাস ভেগাসে গত ১৩ বছরে ‘মাইকেল জ্যাকসন ওয়ান’ শো-এর ৫ হাজারের বেশি প্রদর্শনী হয়েছে। ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত এই শোগুলোর টিকিট বিক্রি চলবে। দর্শকদের সামনে মঞ্চে তুলে ধরা হচ্ছে পপ সম্রাটের শিল্পীসত্তা ও সৃষ্টিশীলতার নানা দিক।

মাইকেল জ্যাকসনের বর্ণিল জীবনে বিতর্কের কমতি ছিল না। তবে এসব বিতর্কের চেয়ে তিনি নিজের শিল্পকর্মকেই বেশি গুরুত্ব দিতেন। এক পুরনো সাক্ষাৎকারে নিজের ত্বকের রঙ পরিবর্তন এবং তাকে ঘিরে ছড়িয়ে পড়া নানা গুজব নিয়ে খোলামেলা কথা বলেছিলেন তিনি।

পেপসির একটি বিজ্ঞাপনে নিজের শৈশবের চরিত্রে একজন শ্বেতাঙ্গ শিশুকে অভিনয় করানোর বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া গুজবকে ‘ভয়ংকর’ ও ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন মাইকেল।

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি কেন চাইব একজন শ্বেতাঙ্গ শিশু আমার চরিত্রে অভিনয় করুক? আমি একজন কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান। কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান হতে পেরে আমি গর্বিত। আমি আমার বর্ণ নিয়ে গর্বিত। আমি যা, তা নিয়ে আমি গর্বিত।’

নিজের পরিচয় প্রসঙ্গে উদাহরণ টেনে তিনি বলেছিলেন, ‘এটা অনেকটা এমন যে, আপনি চাইছেন আপনার ছোটবেলার চরিত্রে কোনো এশীয় মানুষ অভিনয় করুক। এর কোনো মানে হয়?’

মাইকেল জ্যাকসনের ত্বকের রঙ হালকা হয়ে যাওয়া নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা ও বিতর্ক ছিল। এ বিষয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, এটি ত্বক ফর্সা করার কোনো প্রক্রিয়া নয়; বরং এমন একটি চর্মরোগের কারণে তার ত্বকের পিগমেন্টেশন নষ্ট হয়েছিল, যার ওপর তার কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ত্বকের দাগ ঢাকতে তিনি মেকআপ ব্যবহার করতেন।

বিতর্ক প্রসঙ্গে ওই সাক্ষাৎকারে মাইকেল আরও বলেছিলেন, ‘আমি শিল্পের একজন বড় অনুরাগী। একজন শিল্পী কার সঙ্গে বাইরে গেলেন, তা নয়; বরং কী তাকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং তার শৈল্পিক দক্ষতাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।’

১৯৫৮ সালের ২৯ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গ্যারি শহরে এক আফ্রিকান-আমেরিকান শ্রমিক পরিবারে জন্ম মাইকেল জোসেফ জ্যাকসনের। ১০ ভাইবোনের মধ্যে অষ্টম মাইকেল মাত্র ছয় বছর বয়সে ‘জ্যাকসন ফাইভ’ ব্যান্ডের প্রধান গায়ক হিসেবে সংগীতজগতে আত্মপ্রকাশ করেন।

শৈশবে বাবা জো জ্যাকসনের কঠোর শাসন ও শারীরিক নির্যাতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছিল তাকে। তবে পরবর্তী সময়ে সংগীত ও নৃত্যে নিজের অসাধারণ প্রতিভা দিয়ে তিনি বিশ্বসংগীতের ইতিহাসে তৈরি করেন অনন্য এক অধ্যায়।

‘অফ দ্য ওয়াল’, ‘থ্রিলার’, ‘ব্যাড’, ‘ডেঞ্জারাস’ ও ‘হিস্টরি’-এর মতো অ্যালবাম তাকে নিয়ে যায় খ্যাতির শীর্ষে। এর মধ্যে ‘থ্রিলার’ এখনো সর্বকালের সর্বাধিক বিক্রীত অ্যালবামগুলোর একটি হিসেবে স্বীকৃত।

সংগীতের পাশাপাশি নাচেও নতুন যুগের সূচনা করেছিলেন মাইকেল। তার জনপ্রিয় ‘মুনওয়াক’সহ নানা নৃত্যভঙ্গি বিশ্বজুড়ে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে। ক্যারিয়ারে ১৩টি গ্র্যামি ও ২৬টি আমেরিকান মিউজিক অ্যাওয়ার্ডসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি।

বিশ্বজুড়ে তার ৫০ কোটিরও বেশি রেকর্ড বিক্রি হয়েছে। দাতব্য কাজেও ছিল তার বড় অবদান; বিভিন্ন মানবিক উদ্যোগে তিনি বিপুল অর্থ সহায়তা করেছেন।

মৃত্যুর পরও তার জনপ্রিয়তা কমেনি। বরং গান, নাচ, মঞ্চ পরিবেশনা ও জীবনকেন্দ্রিক নানা আয়োজনের মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছেন তিনি।

বিতর্ক তাকে ঘিরে থাকলেও মাইকেল জ্যাকসন শেষ পর্যন্ত নিজের শিল্প দিয়েই সবচেয়ে বেশি পরিচিত। তাই মৃত্যুর ১৭ বছর পরও পপসংগীতের ইতিহাসে তার অবস্থান অমলিন—শিল্পের জগতে তিনি এখনো এক অনন্য কিংবদন্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *