ব্যবসায়ী আব্দুল আহাদ হত্যা: ৮ মাসেও অধিকাংশ আসামি অধরা, তদন্তে সিআইডির গতি ও দৃষ্টান্তমূলক বিচারের আকুতি

বিশেষ প্রতিবেদক  ::

সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, সমাজসেবক ও সর্বজনশ্রদ্ধেয় সালিশ ব্যক্তিত্ব আব্দুল আহাদ হত্যাকাণ্ডের প্রায় আট মাস অতিবাহিত হলেও অধিকাংশ এজাহারভুক্ত আসামি অধরা রয়ে গেছে। ঘটনার দীর্ঘদিন পরও তদন্তে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ, ক্ষোভ এবং নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে। প্রভাবশালী চক্রের অব্যাহত হুমকি ও বিচারহীনতার আশঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে নিহতের পরিবার।
হত্যাকাণ্ডের নেপথ্য ও নৃশংসতার বিবরণ
নিহত আব্দুল আহাদ এলাকায় একজন সফল ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী সালিশ ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় হাট-বাজার, নদী ইজারা এবং বালু-পাথরের ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। পরিবারের দাবি, সীমান্ত এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন অনিয়ম, অবৈধ কালোবাজারি ও চোরাচালানের প্রতিবাদ ও বিরোধিতা করায় তিনি স্থানীয় এক প্রভাবশালী চক্রের তীব্র রোষানলে পড়েন।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর দিবাগত রাতে কয়েকজন ব্যক্তি কৌশলে তাকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায়। পরদিন (১৫ ডিসেম্বর) ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ইস্ট খাসি হিলস জেলার চেল্লা থানার আওতাধীন একটি নির্জন এলাকা থেকে তার রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরবর্তীতে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দেশে এনে সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়।
পরিবারের তথ্যমতে, আব্দুল আহাদের মাথা, বুক, গলা, কোমর ও হাঁটুসহ শরীরের বিভিন্ন অংশে নৃশংস আঘাতের চিহ্ন ছিল। ঘটনাস্থল থেকে রক্তমাখা টি-শার্ট, স্যান্ডেল, গ্যাস লাইট এবং ধস্তাধস্তির আলামত উদ্ধার করে পুলিশ। এছাড়া, ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর ১ নম্বর এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুল আজিজের ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ফোনালাপের অডিও বাদীপক্ষের হাতে আসে। পরিবারের দাবি, অডিওটির পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক বিশ্লেষণ করলে হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচিত হবে।
চোরাচালান ও রাজস্ব ফাঁকির চাঞ্চল্যকর স্বীকারোক্তি
হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত আসামিদের পরিচয় অনুসন্ধানে নেমে স্থানীয়দের কাছ থেকে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। ১ নম্বর আসামি আব্দুল আজিজ গং এলাকায় ভারতীয় গরু-মহিষের বিশাল সীমান্ত চোরাচালান ও ‘কালো স্মাগলিং’ রাজত্ব পরিচালনা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিবেদকের সঙ্গে মোবাইল ফোনে আলাপকালে এজাহারভুক্ত আসামি আব্দুল আজিজ প্রকাশ্যে স্বীকার করেন যে, তিনি ভারত থেকে গরু-মহিষ বাংলাদেশে এনে ব্যবসা করেন। রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি দাম্ভিকতার সঙ্গে বলেন, “সরকারের রাজস্ব দেওয়ার মতো কোনো জায়গা পাই না, তাই রাজস্বও দিই না।” একজন হত্যা মামলার আসামির এমন খোলামেলা চোরাচালান ও কোটি কোটি টাকার সরকারি রাজস্ব ফাঁকির বিষয়ে সুশীল সমাজ ও স্থানীয়দের মনে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযুক্ত আসামিদের তালিকা ও হুমকির মুখে পরিবার
মামলায় মোট ১৩ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরিচয় প্রাপ্ত ১০ জন এজাহারভুক্ত আসামি হলেন:
১. আব্দুল আজিজ (৫৫), পিতা: মৃত আব্দুল গফুর, গ্রাম: বিরেন্দ্রনগর।
২. ইয়াকুব আলী (৪০), পিতা: মৃত মমশ্বর আলী, গ্রাম: শ্রীপুর।
৩. কদ্দুছ আলী (৫০), পিতা: মৃত মমশ্বর আলী, গ্রাম: শ্রীপুর।
৪. ফয়ছল আহমদ (৩৫), পিতা: আব্দুল আজিজ, গ্রাম: বিরেন্দ্রনগর।
৫. (তথ্য সংগৃহীত হচ্ছে)
৬. নজরুল ইসলাম (৫০), পিতা: মৃত আতাউর রহমান, গ্রাম: দ্বীনেরটুক।
৭. আরিফুল ইসলাম (৩৫), পিতা: মৃত আমিনুল ইসলাম শাহা, গ্রাম: শ্রীপুর।
৮. ফখরুল আলম বাবলু (৩৫), পিতা: মৃত মুক্তার আলী, গ্রাম: শ্রীপুর।
৯. আব্দুল আলী (৪৫), পিতা: মৃত ছাদ উল্লা, গ্রাম: তেরাপুর (হাতিরভাঙ্গা)।
১০. আরমান আলী (৩৫), পিতা: কদ্দুছ আলী, গ্রাম: শ্রীপুর।
নিহতের পরিবারের অভিযোগ, অভিযুক্তদের কয়েকজন জামিন নিয়ে বাইরে এসে মামলা তুলে নিতে অনবরত চাপ সৃষ্টি করছে এবং প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। এ বিষয়ে নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। আসামিদের ভয়ে এলাকার সাধারণ মানুষও প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছে না।
গায়েব কাপড়ের আলামত ও সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে রহস্য
হত্যাকাণ্ডের পর নিহত আব্দুল আহাদের মরদেহ দেশে আনা হলে, তার পরনে জ্যাকেট, লুঙ্গি, শার্ট, প্যান্ট ও জুতা ছিল বলে জানান মামলার বাদী ও নিহতের বড় ভাই আব্দুল কাইয়ুম ফারুক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, “আমার ভাইয়ের পরনের সমস্ত কাপড় আমরা তদন্তকারী কর্মকর্তার (আইও) কাছে হস্তান্তর করি এবং তিনি তা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতাভুক্ত একটি কক…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *