মোঃ শাহীন হোসেন:
দেশের প্রাণিসম্পদ খাত একসময় অর্থনীতির অন্যতম শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত হলেও বর্তমানে এটি মারাত্মক সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। খুলনাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ভেটেরিনারি বিভাগের দুর্নীতি, ভেজাল ওষুধের বিস্তার এবং অস্বাস্থ্যকর প্রাণীজ পণ্য বাজারজাতকরণের অভিযোগ বেড়ে চলেছে। সাধারণ জনগণ, খামার মালিক এবং সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা এই খাতের অনিয়মকে একটি বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবে দেখছেন।
খুলনার বিভিন্ন উপজেলায় স্থানীয় অনুসন্ধানে দেখা গেছে, লাইসেন্সবিহীন দোকানগুলোতে অবাধে বিক্রি হচ্ছে ভেজাল ও নিম্নমানের ভেটেরিনারি ওষুধ। অনেক ক্ষেত্রে এসব ওষুধের মোড়ক নকল, উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ জাল করা হচ্ছে। সংরক্ষণের পদ্ধতিও প্রায়শই অস্বাস্থ্যকর। স্থানীয় খামারিদের অভিযোগ, “আমরা ভালো কোম্পানির ওষুধ কিনতে চাই, কিন্তু বাজারে নকল বেশি। অনেক সময় বুঝতেই পারি না কোনটা আসল, কোনটা ভেজাল।” বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ভেজাল ওষুধ প্রাণীর রোগ নিরাময়ে কার্যকর না হয়ে বরং রোগকে জটিল করে এবং প্রাণীর মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ায়।
কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে বিদেশি নিষিদ্ধ ভ্যাকসিন আমদানি করে তা বাজারে বিক্রি করছেন। একই সিরিঞ্জ একাধিক প্রাণীর শরীরে ব্যবহার করা হচ্ছে, যা মারাত্মক সংক্রমণের কারণ হতে পারে। ভেটেরিনারি বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, “এভাবে ভ্যাকসিন প্রয়োগ করলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি না হয়ে বরং নতুন রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বাড়ে।”
খামার পর্যায়ে যথাযথ তদারকি না থাকায় দুধ, মাংস ও ডিমে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে।
দুধে ভেজাল ও রাসায়নিকের ব্যবহার: অনেক খামারে দুধের পরিমাণ বাড়াতে কৃত্রিম হরমোন ব্যবহার করা হচ্ছে। এছাড়া দুধ সংরক্ষণের জন্য ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
মাংসে অস্বাস্থ্যকর প্রক্রিয়া: জবাইয়ের সময় স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে না, অসুস্থ প্রাণীর মাংসও বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষ নানা রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ছে।
ডিম উৎপাদনে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার: পোলট্রি খামারে অযথা অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ফলে “অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR)” বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে মানুষের জন্য মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
খামারিরা অভিযোগ করেছেন, ভেটেরিনারি বিভাগের অনেক কর্মকর্তা নিয়মিত মাঠ পর্যায়ে তদারকি করেন না। অনেক ক্ষেত্রেই তারা অফিসে উপস্থিত থাকেন না বা দায়সারা মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করেন। খুলনার একাধিক খামারি জানান, “সমস্যা হলে আমরা কর্মকর্তাদের পাই না। তারা ফোনও ধরেন না। ফলে আমরা স্থানীয় অদক্ষ চিকিৎসকের উপর নির্ভর করি।”
ভেটেরিনারি ওষুধের দোকান, খামার এবং ক্লিনিকের লাইসেন্স প্রদানে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ ছাড়া লাইসেন্স পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ উঠেছে। একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ব্যবসায়ী বলেন, “লাইসেন্স নিতে গেলে নির্দিষ্ট টাকার বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে হয়। না দিলে ফাইল আটকে রাখা হয়।”
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান আগাম ফাঁস হয়ে যায়, নিম্নমানের ওষুধ জব্দ না করে সমঝোতার মাধ্যমে ছেড়ে দেওয়া হয়। নিয়মিত পরিদর্শনের রিপোর্ট জাল করা হচ্ছে এবং অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের যোগসাজশ রয়েছে। ফলে পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে।
ভেজাল ওষুধ ব্যবহারের কারণে খামারিরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। অনেক সময় রোগ নিরাময় না হয়ে প্রাণীর মৃত্যু ঘটে, ফলে বিনিয়োগের পুরো অর্থই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক খামারি জানান, “একটা গরুর চিকিৎসায় হাজার হাজার টাকা খরচ হয়, কিন্তু ভেজাল ওষুধে কোনো কাজ হয় না। শেষে গরু মারা যায়।”
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, প্রাণীজ পণ্যে ব্যবহৃত ক্ষতিকর রাসায়নিক ও অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার সমস্যার পাশাপাশি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী রোগ সৃষ্টি করতে পারে।
সরকার প্রাণিসম্পদ খাত উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। তবে মাঠ পর্যায়ে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ। আধুনিক ল্যাব স্থাপন করা হলেও কার্যকর ব্যবহার কম, ভেটেরিনারি ক্লিনিক থাকলেও সেবা সীমিত, এবং প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকলেও খামারিরা তা থেকে বঞ্চিত।
বিশেষজ্ঞরা সংকট উত্তরণের জন্য নিম্নলিখিত পদক্ষেপের সুপারিশ করেছেন— ভেজাল ওষুধের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালানো, লাইসেন্সবিহীন দোকান বন্ধ করা, ল্যাব টেস্ট বাধ্যতামূলক করা, কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তি, খামারিদের প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও আইনি ব্যবস্থা জোরদার করা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু আইন প্রণয়ন নয়, তার কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এই খাতের অনিয়ম বন্ধ করা সম্ভব হবে না।
ভেটেরিনারি খাতের এই সংকট শুধুমাত্র প্রাণিসম্পদ নয়, বরং পুরো জাতির জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় হুমকি। ভেজাল ওষুধ, অস্বাস্থ্যকর প্রাণীজ পণ্য এবং দুর্নীতির এই চক্র ভাঙতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।