মানুষের সেবায় অমর এ কে এম আবু তাহের ২২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ, সোনাইমুড়ী ২০ শয্যা হাসপাতাল উদ্বোধন আগামীকাল

মোঃ আনজার শাহ

কিছু মানুষ সময়ের সীমানা পেরিয়ে কেবল ইতিহাসের পাতায় আটকে থাকেন না; মানুষের ভালোবাসা, স্মৃতি এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে তাঁরা বেঁচে থাকেন দীর্ঘকাল। কুমিল্লার বরুড়ার সাবেক সংসদ সদস্য, শিল্পপতি ও সমাজসেবক মরহুম এ কে এম আবু তাহের তেমনই এক উজ্জ্বল নাম। আজ তাঁর ২২তম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০০৪ সালের এই দিনে ৭২ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে বরুড়ার রাজনৈতিক, সামাজিক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে তাঁকে স্মরণ করছেন। একই দিনে বরুড়ার সোনাইমুড়ীতে তাঁর নামে নামকরণ করা ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের বহির্বিভাগীয় চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফলে এবারের মৃত্যুবার্ষিকী তাঁর পরিবার, অনুসারী ও বরুড়াবাসীর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

বরুড়া উপজেলার আদ্রা ইউনিয়নের সোনাইমুড়ী গ্রামের সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এ কে এম আবু তাহের। ব্যবসা, শিল্প, ব্যাংকিং, রাজনীতি ও সমাজসেবার বিস্তৃত পরিসরে তিনি নিজস্ব পরিচিতি গড়ে তোলেন। রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিএনপির প্রার্থী হিসেবে তৎকালীন কুমিল্লা-৭ (বরুড়া) আসন থেকে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্ব করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

রাজনীতি থেকে শিল্পাঙ্গনে:
এ কে এম আবু তাহেরের পরিচয় কেবল একজন রাজনীতিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশের ব্যবসা ও শিল্পক্ষেত্রেও তাঁর ছিল গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তিনি ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য, স্পন্সর পরিচালক ও চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বিভিন্ন শিল্প ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল।
ব্যবসা ও শিল্পকে তিনি শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ক্ষেত্র হিসেবেও কাজে লাগিয়েছেন। শিল্পপতির পরিচয়ের পাশাপাশি সমাজসেবক ও জনহিতৈষী হিসেবে তাঁর নামও সমানভাবে উচ্চারিত হয়।

স্বাস্থ্যসেবায় জনকল্যাণের স্বপ্ন:
বরুড়ার মানুষের সঙ্গে এ কে এম আবু তাহেরের সম্পর্কের অন্যতম উজ্জ্বল অধ্যায় স্বাস্থ্যসেবা। স্থানীয় মানুষের চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করতে সোনাইমুড়ী এলাকায় ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন তিনি। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে হাসপাতালটির জন্য জমি সংগ্রহ ও নির্মাণকাজ শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দীর্ঘ সময় নানা জটিলতায় হাসপাতালটির পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসাসেবা কার্যক্রম চালু হতে পারেনি। তবে ২০২৬ সালে সরকারি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোনাইমুড়ী ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে ‘এ কে এম আবু তাহের ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল’ করা হয়। এতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়।
হাসপাতালটির নামকরণ এ কে এম আবু তাহেরের জনকল্যাণমূলক ভাবনার প্রতি রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা। সংশ্লিষ্টদের আশা, প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গেলে হাসপাতালটি বরুড়ার দক্ষিণাঞ্চলের হাজারো মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্র হয়ে উঠবে।

স্মৃতির সঙ্গে জনসেবার সেতুবন্ধন:
একজন জনপ্রতিনিধির রাজনৈতিক পরিচয় সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যেতে পারে; কিন্তু মানুষের কল্যাণে রেখে যাওয়া কাজের স্মৃতি সহজে মুছে যায় না। এ কে এম আবু তাহেরের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানো, স্থানীয় উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত নানা উদ্যোগ আজও বরুড়ার মানুষের স্মৃতিতে জাগরুক।
তাঁর মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি সময় পর সোনাইমুড়ীর হাসপাতাল তাঁর নাম ধারণ করেছে। একই সঙ্গে হাসপাতালটিতে চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ তাঁর স্মৃতিকে নতুন করে মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত করছে। প্রয়াত একজন জনপ্রতিনিধির নাম যখন মানুষের চিকিৎসাসেবার সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা হয়, তখন স্মৃতি ও জনকল্যাণের মধ্যে তৈরি হয় এক অনন্য সেতুবন্ধন।

জাতীয় পর্যায়েও ছিল শোক:
২০০৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর এ কে এম আবু তাহেরের জীবনাবসান ঘটে। সংসদ সদস্য থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যুতে জাতীয় পর্যায়েও শোকের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যক্তিত্ব তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেন বলে সমসাময়িক সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
আজ ২২ বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যায়, তাঁর জীবনের একটি অধ্যায় শেষ হলেও জনকল্যাণের নানা উদ্যোগ তাঁর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। বিশেষ করে সোনাইমুড়ীর ২০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল তাঁর নামে নামকরণ এবং চিকিৎসাসেবা চালুর উদ্যোগ বরুড়ার মানুষের কাছে তাঁর অবদানের নতুন স্বীকৃতি হয়ে উঠেছে।

বরুড়ার মাটি ও মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত এ কে এম আবু তাহের তাই শুধু একটি রাজনৈতিক সময়ের নাম নন; তিনি বরুড়ার উন্নয়ন, শিল্প, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণের স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
২২তম মৃত্যুবার্ষিকীতে মরহুম এ কে এম আবু তাহেরের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর কর্ম, আদর্শ ও জনকল্যাণের স্মৃতি বরুড়ার মানুষের মাঝে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকুক।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *