স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানীর মিরপুর-১ নম্বর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য এক আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এখানে ‘ফজর-আলম-সবুজ’ নামক একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যাদের ইশারা ছাড়া অফিসের একটি পাতাও নড়ে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এই চক্রটির মাধ্যমে সরকারি এই দপ্তরে অবাধে চলছে ঘুষ-বাণিজ্য, নথি জালিয়াতি এবং নানা প্রশাসনিক অনিয়ম। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের দাবি, সাব-রেজিস্ট্রার বদলি হয়ে আসলেও এই সিন্ডিকেটের বেড়াজাল ভেঙে বের হতে পারেন না; বরং স্বল্প সময়ের মধ্যেই তিনি এই চক্রের প্রভাবের মুখে পড়েন। ফলে সাধারণ মানুষ জমি কেনা-বেচা বা দলিল নিবন্ধনের মতো মৌলিক সেবা পেতে গিয়ে চরম হয়রানি ও আর্থিক শোষণের শিকার হচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই চক্রের মূল হোতা হিসেবে পরিচিত ফজর আলী। অভিযোগ রয়েছে, দলিল রেজিস্ট্রেশনের সময় ফজর খোদ সাব-রেজিস্ট্রারের ডান পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং তার সবুজ সংকেত ছাড়া কোনো দলিল সম্পন্ন হয় না। অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী ও বাইরের দালালচক্রের সমন্বয়ে এই শক্তিশালী বলয়টি তৈরি করা হয়েছে। জমি নিবন্ধনের সময় সরকারি কর ফাঁকি দিতে শ্রেণির পরিবর্তন, কম মূল্যে (লেস ভ্যালু) দলিল সম্পাদন, এমনকি ভুয়া দাতা সাজিয়ে ও এনআইডি জালিয়াতির মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে। সেবাগ্রহীতারা জানান, প্রতিটি দলিলে ন্যূনতম কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত ‘ম্যানেজমেন্ট’ খরচ দাবি করা হয়। এই দাবিকৃত টাকা না দিলে ফাইল মাসের পর মাস ঝুলে থাকে অথবা নানা ঠুনকো অজুহাতে ফেরত দেওয়া হয়।
সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবে নাম এসেছে অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারী আলমের। অভিযোগ আছে, অবসরে যাওয়ার পরও আলম নিয়মিত অফিসে উপস্থিত থেকে দালালি কার্যক্রম তদারক করেন এবং অবৈধ অর্থের ভাগাভাগি নির্ধারণ করেন। এছাড়া অফিসের নাইট গার্ডদের বিরুদ্ধেও ক্ষমতার অপব্যবহার করে ‘রামরাজত্ব’ কায়েম করার অভিযোগ তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। স্থানীয়দের মধ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য ছড়িয়েছে যে, স্বল্প আয়ের কর্মচারী হয়েও এই চক্রের সদস্যরা বিপুল বিত্ত-বৈভবের মালিক হয়েছেন। বিশেষ করে ফজরের নামে মিরপুরসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থানে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং তার গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুরে অঢেল স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির পাহাড় গড়ে উঠেছে বলে জানা গেছে। তাদের জীবনযাত্রার মান ও সম্পদের উৎস নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তের দাবি উঠেছে।
প্রশাসনিক এই স্থবিরতা ও নীরবতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যা সিন্ডিকেটটিকে আরও বেপরোয়া করে তুলেছে। একজন সাবেক সাব-রেজিস্ট্রার নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, দলিল লেখক ও নকল নবীশদের একটি বড় অংশ এই অবৈধ ভাগাভাগির সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে এই অচলাবস্থা নিরসনে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযুক্তদের সম্পদের উৎস যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া অফিসে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও ডিজিটাল মনিটরিং বাধ্যতামূলক করা এবং সম্পূর্ণ অনলাইন পেমেন্ট ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে নগদ লেনদেন বন্ধ করার দাবি জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বছরের পর বছর একই স্থানে কর্মরত থাকা এই সিন্ডিকেট সদস্যদের নিয়মিত বদলি ও রোটেশন নীতি কঠোরভাবে প্রয়োগ করা না হলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়। সম্প্রতি অভিযুক্ত ফজরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। ভুক্তভোগীদের প্রত্যাশা, প্রশাসনের কার্যকর হস্তক্ষেপে দ্রুত এই সিন্ডিকেট ভেঙে ফেলা হবে এবং সাধারণ মানুষ যেন আর জিম্মি না হয়, তা নিশ্চিত করা হবে। এই দুর্নীতির মহোৎসব বন্ধ করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা ফিরিয়ে আনাই এখন মিরপুরবাসীর প্রধান দাবি। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমেই কেবল এই অরাজকতার অবসান ঘটতে পারে।