মিরসরাইয়ে এলপি গ্যাস সংকট: রান্নার চুলা না জ্বলে মানুষের ভোগান্তি, প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি

এন আলম রাসেল চৌধুরী

চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার উত্তরাঞ্চলে এলপি (লিকুইফাইড পেট্রোলিয়াম) গ্যাসের তীব্র সংকটের কারণে সাধারণ মানুষ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। বারইয়ারহাট, করেরহাট ও শান্তিরহাটসহ বিস্তীর্ণ এলাকায় এক সপ্তাহ ধরে ডিলার ও খুচরা পর্যায়ে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ না হওয়ায় রান্নার কাজ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে মধ্যবিত্ত পরিবার, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং গৃহিণীরা ভিন্ন রকম সমস্যা সম্মুখীন হচ্ছেন।

সরাসরি বাজারে ঘুরে দেখা গেছে বেশিরভাগ ডিলারের দোকানের সামনে বড় বড় অক্ষরে লেখা “গ্যাস নেই” সাইনবোর্ড। মানুষ খালি সিলিন্ডার নিয়ে এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটছেন, কিন্তু মিলছে না গ্যাস। হাতেগোনা কিছু দোকানে সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও তা সাধারণ ক্রেতার নাগালের বাইরে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ মাত্র ১০ শতাংশের নিচে নেমে যাওয়ায় এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।

গ্যাসের সংকটের সবচেয়ে তীব্র প্রভাব পড়েছে হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলোতে। বারইয়ারহাটের ‘বিসমিল্লাহ হোটেল’-এর মালিক জানান, “সকাল থেকে কাস্টমার আসছে, কিন্তু গ্যাস না থাকায় আমরা রান্না করতে পারছি না। এভাবে চললে কর্মচারীদের বেতন দেওয়া তো দূরের কথা, ব্যবসা বন্ধ করতে হতে পারে।” অনেকে ভিন্ন পদ্ধতিতে রান্নার চেষ্টা করছেন, যেমন মাটির চুলা বা ইলেকট্রিক কুকার ব্যবহার। তবে এই বিকল্পও সম্পূর্ণ কার্যকর নয়, কারণ বড় পরিমাণ খাবার রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।

স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দুই দিন ধরে গ্যাস না থাকায় রান্না কার্যক্রম বন্ধ, পরিবারকে ঘরোয়া পদ্ধতিতে খেতে বাধ্য। শান্তিরহাটের রিনা আক্তার বলেন, “সিলিন্ডার শেষ হয়ে গেছে, বাজারে পাচ্ছি না। বাধ্য হয়ে কেরোসিন বা কাঠ দিয়ে রান্না করতে হচ্ছে। কিন্তু সেটা ঝুঁকিপূর্ণ এবং সময়সাপেক্ষ।”

সংকটের মূল কারণ সম্পর্কে খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, বড় কোম্পানি পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করছে না। তবে সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ ভিন্ন। তারা মনে করেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ‘মজুতদারি’ বা কালোবাজারে অতিরিক্ত মূল্যে বিক্রি করছেন। নির্ধারিত সরকারি দামের চেয়ে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা বেশি দিয়ে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। করেরহাটের একজন ডিলার বলেন, “আমরা আগে থেকেই অর্ডারের টাকা দিয়েছি, কিন্তু ডিপো থেকে গ্যাস আসছে না। সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সংকট কমার কোনো লক্ষণ নেই।”

সংকটের কারণে বাজারে জনমনে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভেঙে বাজারে ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান পরিচালনা করা জরুরি। নইলে এলপি গ্যাস সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও নিত্যপণ্যের বাজারে বিরূপ প্রভাব ফেলবে।

উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কাছে মানুষের আবেদন, সরবরাহ স্বাভাবিক করতে তৎপর হোন এবং কালোবাজারি প্রতিরোধে কঠোর পদক্ষেপ নিন। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা ও ভুক্তভোগীরা আশঙ্কা করছেন, সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে হোটেল-রেস্তোরাঁ বন্ধ হতে পারে এবং রান্নার জন্য মানুষকে আরও ব্যয়বহুল বিকল্পের দিকে যেতে হবে।

এলপি গ্যাস সংকটের এই চিত্র মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনকে প্রভাবিত করছে। অল্প সময়ে সমাধান না হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বৃদ্ধি পাবে। সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা অতীব জরুরি, যাতে এলপি গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হয় এবং বাজারে কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে আসে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *