রাজউকের অফিস সহকারী সাইফুল ইসলামের কোটি কোটি টাকার সম্পদ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এক অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের বিরুদ্ধে আয় বহির্ভূত বিপুল সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বর্তমানে রাজউকের মহাখালী আঞ্চলিক অফিসের জোন-৪ এ কর্মরত রয়েছেন। সরকারি হিসাব অনুযায়ী তার মাসিক বেতন সর্বসাকল্যে প্রায় ৪০ হাজার টাকা। অথচ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, এই সীমিত আয়ের বিপরীতে তিনি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে গড়ে তুলেছেন অঢেল সম্পদের পাহাড়।

অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর উত্তরার দক্ষিণখানে ৩ দশমিক ৩১ কাঠা জমির ওপর মো. সাইফুল ইসলাম নির্মাণ করেছেন একটি ৮ তলা বিলাসবহুল অট্টালিকা। জমিটি ১২৪৭৭ নম্বর কবলা দলিল অনুযায়ী তার নামে রেজিস্ট্রিকৃত। দলিল সূত্রে দেখা যায়, জমিটির সিএস দাগ নম্বর ৩৪৫ এবং আরএস দাগ নম্বর ৯৮২।

এছাড়াও একই এলাকায় তিনি ২০১১ সালে ১৩৭২৯ নম্বর কবলা দলিলের মাধ্যমে আরও একাধিক জমি ক্রয় করেন। এসব জমির মধ্যে রয়েছে—সিএস দাগ নম্বর ১৯৯, এসএ দাগ নম্বর ১৪, আরএস দাগ নম্বর ২ (ঢাকা মহানগর জরিপ-১৪, ফায়দাবাদ মৌজা) এবং সিএস দাগ নম্বর ৮৫, এসএ দাগ নম্বর ১৭১, আরএস দাগ নম্বর ২৩২ (ঢাকা মহানগর জরিপ, খতিয়ান নম্বর ১৮২৩)।

শুধু রাজধানীতেই নয়, চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় তিনি ১২টিরও বেশি প্লট ও জমি ক্রয় করেছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে। এসব জমির দলিল ও প্রমাণপত্র দৈনিক জনবাণীর হাতে সংরক্ষিত রয়েছে।

রাজনৈতিক সুপারিশে চাকরি, এরপরই সম্পদের উত্থান

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মো. সাইফুল ইসলাম চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন প্রভাবশালী সদস্য। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের সাবেক গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের সুপারিশে তিনি রাজউকে চাকরি লাভ করেন। চাকরিতে যোগদানের পর থেকেই তার আর্থিক অবস্থার নাটকীয় পরিবর্তন ঘটে।

একজন অফিস সহকারী হয়েও তিনি রাজউকের প্লট বিক্রি, নকশা পাস করিয়ে দেওয়া এবং বিভিন্ন অবৈধ সুবিধা আদায়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে অভিযোগ উঠেছে। এসব কার্যক্রমের মাধ্যমেই তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র দাবি করেছে।

দুদকে অভিযোগ, কিন্তু ব্যবস্থা হয়নি

তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালেই মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছিল। তবে দলীয় প্রভাব ও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় তিনি সে সময় কোনো ধরনের শাস্তি ছাড়াই পার পেয়ে যান।

বিলাসী জীবনযাপন ও সন্দেহজনক লেনদেন

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মো. সাইফুল ইসলাম নিয়মিতভাবে প্রতি সপ্তাহে দুই থেকে তিনবার বিমানে চড়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করতেন। তার ব্যবহার্য মোবাইল ফোন হিসেবে রয়েছে লাখ টাকার আইফোন। তার মালিকানায় ছিল কোটি টাকা মূল্যের একটি টয়োটা হায়েস গাড়ি, যা ৫ আগস্ট আওয়ামী সরকার পতনের পর তিনি বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্টের পর তিনি নিজের ব্যাংক হিসাবে থাকা প্রায় ৫০ কোটি টাকা তার পিতার ব্যাংক হিসাবে স্থানান্তর করেছেন। বিষয়টি নিয়ে আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

হত্যা মামলা ও অফিসে অনুপস্থিতি

চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের মিরসরাই থানায় একটি হত্যা মামলা চলমান রয়েছে। এর পরও তিনি কীভাবে রাজউকের চাকরিতে বহাল রয়েছেন এবং নিয়মিত অফিস না করেও প্রভাব খাটিয়ে দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

এমনকি অভিযোগ রয়েছে, ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে তিনি নিজের বাসায় আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের আশ্রয় ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন।

অভিযুক্তের দাবি

এ বিষয়ে মো. সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, তিনি কোনো অবৈধ পথে সম্পদ অর্জন করেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, রাজউকের বিভিন্ন প্লট বিক্রির কমিশনের অর্থ থেকেই তিনি এসব সম্পদের মালিক হয়েছেন।

জমি ক্রয়ের বিস্তারিত হিসাব

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তিনি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার পশ্চিম ইছাখালী, উত্তর ইছাখালী ও পূর্ব মিঠানালা মৌজায় একাধিক কবলা দলিলের মাধ্যমে শতাধিক শতাংশ জমি ক্রয় করেছেন। এসব জমির ঘোষিত মূল্য কয়েক লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ হলেও বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

রাজউকের প্রতিক্রিয়া

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রিয়াজুল ইসলাম দৈনিক জনবাণীকে বলেন,
“রাজউকে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান জিরো টলারেন্স। অপরাধী যে-ই হোক, প্রমাণ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রশ্ন রয়ে গেল

একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর কীভাবে স্বল্প বেতনে এতো বিপুল সম্পদের মালিক হলেন—সে প্রশ্নের এখনো কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিয়ে দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে বিভিন্ন মহলে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *