স্টাফ রিপোর্টার:
মিয়ানমারের মংডু শহরের পূর্বদিকে অবস্থিত বুছিদং এলাকায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যভিত্তিক বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মি (এএ)-র দমন–নিপীড়নের ফলে ভিটে ও ঘরহারা হয়েছে হাজার হাজার রোহিঙ্গা পরিবার। আরাকান আর্মির নির্যাতনের মুখে অভিযোগ রয়েছে— তারা মিয়ানমারের বুছিদং এলাকায় অনেক রোহিঙ্গা পরিবারের নগদ টাকা, স্বর্ণ ছিনিয়ে নিয়ে মালয়েশিয়ার উদ্দেশ্যে জোর করে বোটে তুলে দিচ্ছে। মুঠোফোনে খবরটি জানিয়েছেন বুছিদংয়ের স্থানীয় রোহিঙ্গা কমিউনিটির লোকজন।
রোহিঙ্গারা জানিয়েছেন, মংডু শহরের আশপাশে অবস্থিত রোহিঙ্গারা আরাকান আর্মি “মগ বাগি”র নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাঁচাতে প্রতিনিয়ত দুই–এক পরিবার চুরি করে বাংলাদেশে ছুটে আসছে। মিয়ানমারের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী মুসলিম দেশ বাংলাদেশের সীমান্ত থাকায় চলে আসার সুযোগও রয়েছে তাদের। তবে বুছিদং এলাকা ভৌগোলিকভাবে একটু ভিন্ন। পূর্বে–পশ্চিমে পাহাড়, মাঝখানে রোহিঙ্গা মুসলমানদের গ্রাম—ফলে পালাবার পথ সংকুচিত। আরাকান আর্মির সশস্ত্র সদস্যরা নিশীথ রাতে রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর তল্লাশির নামে তচনচ ও লুটপাট করে। রাত শেষে বাড়িঘর ছেড়ে দিতে চাপ সৃষ্টি করে। তাদের স্পষ্ট বক্তব্য— জান্তা সরকারের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধ করতে হবে, সুতরাং এলাকা খালি করতে হবে। এভাবে ঘরভিটে হারা রোহিঙ্গাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে থাইল্যান্ড–মালয়েশিয়া চলে যেতে কু–প্ররোচনায় লিপ্ত আরাকান আর্মি।
গত ৯ নভেম্বর, রবিবার ২০২৫—মালয়েশিয়া সীমান্তের কাছে উপকূলে রোহিঙ্গা অভিবাসীবাহী নৌকা ডুবে শত শত লোক নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনার পর ১০ জনকে জীবিত এবং একজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
মালয়েশিয়ার নৌ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া জীবিতদের মধ্যে তিনজন মিয়ানমারের পুরুষ ও দুইজন রোহিঙ্গা পুরুষ। কর্তৃপক্ষ আরও জানায়, মিয়ানমারের বুছিদং থেকে প্রায় ৩০০ জন যাত্রী নিয়ে কার্গো জাহাজটি যাচ্ছিল। মালয়েশিয়ার জনপ্রিয় রিসোর্ট দ্বীপ “লংকাওয়ে”-র ঠিক উত্তরে তারুতাও দ্বীপের কাছে এ ঘটনাটি ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উদ্ধার তৎপরতা চলছে, আরও হতাহতদের পাওয়া যেতে পারে।
মালয়েশিয়ার স্থানীয় পুলিশ প্রধান আদজলি আবু শাহ সাংবাদিকদের বলেন, মালয়েশিয়াগামী লোকজন প্রথমে একটি বড় নৌকায় উঠেছিল। কিন্তু সীমান্তের কাছাকাছি আসার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষের নজর এড়াতে তাদের তিনটি ছোট নৌকায় স্থানান্তরিত করা হয়। প্রতিটি নৌকায় প্রায় ৯০–১০০ জন যাত্রী ছিল। তিনি আরও বলেন, তিনটি নৌকার মধ্যে ৯০ জন যাত্রী বহনকারী একটি নৌকা ডুবে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ঘটনায় অনেক রোহিঙ্গার সলিলসমাধি হয়েছে।
মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড উপকূলে মিয়ানমার থেকে আসা বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাবাহী নৌকা ডুবে অন্তত ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। এতে নিখোঁজ রয়েছেন আরও অনেকে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর) এবং আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) মঙ্গলবার (১১ নভেম্বর) এক যৌথ বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে। মর্মান্তিক এ ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করেছে বৈশ্বিক সংস্থা দুটি।
যৌথ বিবৃতিতে সংস্থা দুটি জানায়, প্রায় ৭০ জনকে বহনকারী নৌকাটি ডুবে যায়। মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করেছে। থাইল্যান্ড উপকূলে দুই কিশোরীসহ ২১ রোহিঙ্গার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নৌকায় থাকা বাকিদের এখনো কোনো খোঁজ মেলেনি।
ইউএনএইচসিআর ও আইওএম মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ এবং স্থানীয়দের জীবনরক্ষাকারী প্রচেষ্টার প্রশংসা করেছে। সংস্থাগুলো জানিয়েছে, তারা জীবিতদের সহায়তায় স্থানীয় প্রশাসনকে সমর্থন দিতে প্রস্তুত।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সম্ভাব্য প্রাণহানির ব্যাপারে আমরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি। কারণ খবর পাওয়া গেছে, আরও একটি নৌকা এখনো সমুদ্রে ভাসছে, যাতে প্রায় ২৩০ জন রোহিঙ্গা রয়েছে।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে ৫ হাজার ৩০০–রও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রায় পা রেখেছেন। এর মধ্যে ৬০০ জনেরও বেশি নিখোঁজ বা প্রাণ হারিয়েছেন।
ইউএনএইচসিআর ও আইওএম জানিয়েছে, বাংলাদেশের কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরে সীমিত সহায়তা, কর্মসংস্থানের অভাব, মিয়ানমারে চলমান সংঘাত ও মানবিক সংকট—সব মিলিয়ে আরও বেশি রোহিঙ্গা নিরাপত্তার খোঁজে প্রাণঘাতী সমুদ্রপথে যাত্রা করতে বাধ্য হচ্ছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব বিপজ্জনক যাত্রায় অংশ নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে দুই–তৃতীয়াংশই নারী ও শিশু।
যৌথ বিবৃতিতে সংস্থা দুটি বলেছে, সমুদ্রে বিপদাপন্নদের জীবন রক্ষা মানবিক দায়িত্ব এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনে এটি একটি বাধ্যবাধকতা। সংস্থা দুটি অনুসন্ধান ও উদ্ধার সক্ষমতা বাড়াতে এবং শরণার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
ইউএনএইচসিআর ও আইওএম মনে করে, যতদিন মিয়ানমারের সংঘাত ও রোহিঙ্গা বাস্তুচ্যুতির মূল কারণগুলো সমাধান না হবে, ততদিন পর্যন্ত এ বিপজ্জনক সমুদ্রযাত্রা থামানো কঠিন হবে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুরা বৌদ্ধ–সংখ্যাগরিষ্ঠ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে যাচ্ছেন। সাম্প্রতিককালে আরাকান আর্মির নির্যাতনের মুখে সাগর পথে প্রায়শই নৌকা ডুবে মৃত্যু ও নিখোঁজের খবর আসে।