স্টাফ রিপোর্টার:
কেরানীগঞ্জ মডেল সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সংস্কারের নামে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা থাকলেও বাস্তবে সেখানে চলছে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রকাশ্য মহোৎসব। সাব-রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ মিরাজউদ্দিন ও দলিল লেখক ভেন্ডার সমিতির আহ্বায়ক মিলনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের কাছে বর্তমানে জিম্মি হয়ে পড়েছেন সাধারণ সেবাপ্রার্থীরা। অভিযোগ উঠেছে, দলিলের টিপসই থেকে শুরু করে নকল উত্তোলন—প্রতিটি ধাপে গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা হচ্ছে অতিরিক্ত মোটা অঙ্কের টাকা। ঘুষ না দিলে দিনের পর দিন আটকে রাখা হচ্ছে প্রয়োজনীয় দলিল, আর প্রতিবাদ করলে স্থানীয় ক্যাডার ও কতিপয় নামধারী সংবাদকর্মীর ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে দমিয়ে রাখা হচ্ছে। বিশেষ করে কালবেলার কেরানীগঞ্জ প্রতিনিধি পরিচয়ধারী ইমরুল কায়েসের মাধ্যমে মূলধারার পেশাদার সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়া এবং মামলা-হামলার হুমকি দেওয়া এখন ওই অফিসের নিত্যদিনের চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অফিসের অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক কাঠামোতেও চলছে ব্যাপক অনিয়ম। নিয়মবহির্ভূতভাবে নকলনবিশ খলিলুর রহমানকে সহকারীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এবং অফিস সহকারী রতন আগের চেয়ে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।
৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর দেশের প্রতিটি সেক্টরে যখন সংস্কারের জোয়ার চলছে, তখন ঢাকা লাগোয়া এই গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারের রাজস্ব আদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম খাত এই রেজিস্ট্রেশন বিভাগ হলেও কেরানীগঞ্জ মডেল অফিসে দুর্নীতির কারণে সরকার বিশাল অংকের রাজস্ব হারাচ্ছে। প্রতিদিন এই অফিসে ২৫০ থেকে ৩০০ দলিল রেজিস্ট্রি হয়, যার একটি বড় অংশই ঢাকা থেকে আসা সাধারণ ক্রেতা। আবাসন সংকটের কারণে মধ্যবিত্ত মানুষ কেরানীগঞ্জে জমি কিনতে এলেও রেজিস্ট্রির সময় তারা সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। এখানে ঘুষের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ফিস’। কেরানি, মোহরার থেকে শুরু করে সাব-রেজিস্ট্রারের মনোনীত প্রতিনিধি আলম পর্যন্ত সবাই এই অবৈধ অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত। সাব-রেজিস্ট্রার মিরাজউদ্দিন নিজে সরাসরি টাকা গ্রহণ না করলেও তার বিশেষ সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই সমস্ত লেনদেন সম্পন্ন হয়। এর আগে দায়িত্বরত সাব-রেজিস্ট্রার রায়হান মিয়ার আমলেও এই সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল, যা বর্তমানে মিরাজউদ্দিনের ছায়ায় আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে যে, দাতা ও গ্রহীতার মধ্যে জমির প্রকৃত বিনিময় মূল্য অনেক বেশি থাকলেও রেজিস্ট্রেশন ফি বাঁচাতে দলিলের মূল্য অনেক কম দেখানো হয়। এতে ক্রেতার কালো টাকা সাদা করার সুযোগ তৈরি হয় এবং সরকার তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়। এছাড়াও জাল পে-অর্ডার বা ব্যাংক ড্রাফট জমা দেওয়ার মাধ্যমে বড় ধরনের জালিয়াতির সুযোগ করে দিচ্ছে এই সিন্ডিকেট। প্রতিটি দলিলের জন্য সরকারি ফির বাইরে ‘অফিস খরচ’ ও ‘সাংবাদিক ম্যানেজ’ ফান্ডের নামে প্রতি লাখে ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। মোহরার নবীন জানান, প্রতিটি দলিলে জমির মোট মূল্যের ওপর ১ শতাংশ টাকা অফিসকে না দিলে কোনোভাবেই দলিল সম্পাদন সম্ভব হয় না। এমনকি দলিলের একটি সাধারণ নকল তুলতেও গ্রাহকদের বাড়তি দুই থেকে তিন হাজার টাকা গুনতে হয়। নিয়মানুযায়ী অফিসের দেয়ালে মূল্যতালিকা টাঙানো থাকার কথা থাকলেও কার্যত সেখানে সিন্ডিকেটের ইচ্ছাই শেষ কথা। এই ভয়াবহ অনিয়ম ও ঘুষ বাণিজ্য নিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার মিরাজউদ্দিনের সাথে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ব্যস্ততার অজুহাতে এড়িয়ে যান এবং কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। ফলে কেরানীগঞ্জ মডেল সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এখন অনিয়ম আর শোষণের এক অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে।