মোঃআনজার শাহ
সরকারের ব্যয়-সংকোচন, জ্বালানি সাশ্রয় এবং পুলিশের জনবল ও যানবাহন সংকট বিবেচনায় এনে মন্ত্রিসভার ১৮ সদস্যের জন্য বরাদ্দ বিশেষ পুলিশ প্রোটেকশন এসকর্ট প্রত্যাহার করেছে সরকার; তবে দায়িত্বের গুরুত্ব বিবেচনায় ছয় জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা এ সুবিধা বহাল রাখেন।
সরকারি কোষাগার ও নিরাপত্তা সংস্থান সংরক্ষণের উদ্দেশ্য নিয়ে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় পুলিশ সদর দফতিকে ভিআইপি নিরাপত্তা ব্যয়ে কড়াকড়ি চালানোর নির্দেশ দেয়। নির্দেশক্রমে মন্ত্রিসভার ২৪ পূর্ণমন্ত্রীর মধ্যে ১৮ জনের জন্য বরাদ্দ করা বিশেষ পুলিশ এসকর্ট (প্রোটেকশন এসকর্ট) প্রত্যাহার করা হয়েছে। নির্দেশ বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকা মহানগর পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নিশ্চিত করেছেন।
সরকারি সূত্র জানায়, অর্থ- ও জ্বালানি সাশ্রয়, পাশাপাশি পুলিশের সীমিত জনবল ও যানবাহন সংস্থান বিবেচনায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে যে যেসব মন্ত্রীর দায়িত্ব বিশেষ গুরুত্ব বহন করে বা যাদের যাত্রাপথে অতিরিক্ত ঝুঁকি রয়েছে, তাদের জন্য বিদ্যমান প্রটোকল অনুযায়ী গানম্যান, হাউস গার্ড ও ঢাকার বাইরে সফরে বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তা আগের মতোই থাকবে।
সরকারি ঘোষিত তালিকা অনুযায়ী এসকর্ট সুবিধা বহাল রাখা হয়েছে: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর; অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ; বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ; মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী ডা. আবু জাফর মো. জাহেদ হোসেন; পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান; এবং প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
অন্যদিকে এসকর্ট প্রত্যাহারের তালিকায় রয়েছেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ, পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম, শিল্প, বস্ত্র, পাট ও বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির, শ্রম ও কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক, তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদ উদ্দীন চৌধুরী অ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন, ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম এবং সড়ক পরিবহন, সেতু, রেলপথ ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
এসকল প্রান্তিক বদল সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ থেকেই কার্যকর করা হয়েছে বলে একাধিক মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও ডিএমপির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদেশ প্রাপ্ত দিন থেকেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর এসকর্ট প্রত্যাহার কার্যকর করা হয়েছে; তবু সরকারি বিধি অনুযায়ী তাঁরা আগের মতোই গানম্যান, হাউস গার্ড ও ঢাকার বাইরে সফরে বিশেষ পুলিশি নিরাপত্তা পাবেন।
পুলিশের মানবশক্তি ও যানবাহন সংকট
ঢাকা মহানগর পুলিশের তথ্যে, বর্তমানে ঢাকায় ৪৯ জন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির নিরাপত্তায় ১ হাজার ৬৯১ জন পুলিশ সদস্য দায়িত্বরত থাকেন। প্রয়োজনীয় সংখ্যা ২ হাজার ৫৭৫ জন হলেও প্রায় ৮৮৪ জন ঘাটতি রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে যারা দায়িত্বে রয়েছেন তাদের অতিরিক্ত সময় কাজ করতে হচ্ছে এবং শারীরিক ও মানসিক চাপ বেড়েছে পুলিশ সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
পুলিশ কর্মকর্তারা আরও জানান, জনবল সংকটের সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা যানবাহনের অভাব পরিস্থিতিকে জটিল করছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনের সময় বিভিন্ন থানায় ও পুলিশ স্থাপনায় হামলায় প্রোটেকশন ইউনিটের কয়েকটি গাড়ি পুড়ে যাওয়ায় বর্তমানে যানবাহনের ঘাটতিও প্রকট। ফলে সীমিত গাড়ি এবং জনবল নিয়েই একাধিক ভিআইপির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হচ্ছে, যা শিফট-বদলে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
ব্যয় ও জ্বালানির হিসাব
সরকারি হিসাব মতে, একজন মন্ত্রীর এসকর্ট টিম সাধারণত একজন উপপরিদর্শক (এসআই) ও চারজন কনস্টেবল এবং একটি পুলিশ পিকআপ ভ্যান নিয়ে গঠিত। সংশ্লিষ্ট সদস্যদের বেতন-ভাতা, যানবাহন ও জ্বালানির খরচ সরকারি কোষাগার থেকে উত্তোলন করা হতো। এই খরচ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে নিরাপত্তা ব্যয় সংকুচনের এই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে বলে প্রশাসনিক সূত্র জানায়।
রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা প্রতিক্রিয়া
নিরাপত্তা ও সরকারি ব্যয়ের সংহতীকরণকে পক্ষ থেকে সমর্থন পাওয়া গেলেও ভূয়সী গুরুত্ব সহকারে দায়িত্ব পালন করা ব্যক্তিদের নিরাপত্তা কিভাবে প্রভাবিত হবে সে নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর দপ্তরে শঙ্কাও দেখা দিয়েছে। প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠ দূরত্বে গানম্যান বা হাউস গার্ড-সংরক্ষণের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত রাখা হবে এমন প্রতিশ্রুতি সরকারি দফতরের পক্ষ থেকে এসেছে।
এ সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক পরিবেশে কিভাবে প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে তা নজরদারিতে রয়েছেন পর্যবেক্ষকরা। সরকারি নিরাপত্তা সংক্রান্ত ব্যয় হ্রাসে প্রধানমন্ত্রী নিজেও তাঁর নিরাপত্তা বহর ছোট করার সিদ্ধান্ত নেন বলে সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, এবং এ নির্দেশনা পরবর্তী সময়ে ভিআইপি নিরাপত্তা সংস্কারে আরও কড়াকড়ি আনতে পারে বলেও আলোচ্য সূত্রে ইঙ্গিত আছে।