বিশেষ প্রতিনিধি:
সর্বজনীন পেনশন কর্মসূচিকে আরও আকর্ষণীয় করতে একগুচ্ছ নতুন উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব করেছে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে জরুরি আর্থিক প্রয়োজনে কর্মসূচি থেকে বের হওয়ার সুযোগ, পেনশনভোগীর মৃত্যুর পর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন দেওয়া এবং বর্তমান ৬০ বছরের পরিবর্তে ৫৫ বছর বয়স থেকেই পেনশন চালুর প্রস্তাব।বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। এটি কর্তৃপক্ষের চতুর্থ পরিচালনা পর্ষদের বৈঠক। এতে উপস্থাপনের জন্য ১১টি আলোচ্যসূচি রাখা হয়েছে।বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। পর্ষদ যেসব প্রস্তাব অনুমোদন করবে, সেগুলো পরবর্তী সময়ে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ।বর্তমানে চারটি সর্বজনীন পেনশন স্কিম চালু রয়েছে। এগুলো হলো—প্রগতি, সুরক্ষা, সমতা ও প্রবাস। এসব স্কিমের মাধ্যমে কর্মজীবী, অনিয়মিত আয়ের মানুষ ও প্রবাসীদের পেনশন সুবিধার আওতায় আসার সুযোগ রয়েছে। দেশের চার শ্রেণির প্রায় ১০ কোটি মানুষের কথা বিবেচনায় নিয়ে ২০২৩ সালের ১৭ আগস্ট সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থা চালু করা হয়।জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে, চালুর তিন বছর পর চারটি স্কিমে এ পর্যন্ত নিবন্ধিত হয়েছেন ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৯২০ জন গ্রাহক। তাঁদের জমা করা মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৮৮ কোটি ৫২ লাখ টাকা।সমতা স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ২ লাখ ৮৭ হাজার ২২৪ জন। তাঁদের জমা করা অর্থের পরিমাণ ৫৬ কোটি ৮৫ লাখ টাকা। অন্যদিকে, প্রবাসীদের জন্য নির্ধারিত প্রবাস স্কিমে সাড়া সবচেয়ে কম। এতে এ পর্যন্ত মাত্র ১ হাজার ১৭১ জন প্রবাসী নিবন্ধিত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে নারী ৯৭ জন। এ স্কিমে মোট জমা করা আমানতের পরিমাণ ১১ কোটি ৮৭ লাখ টাকা।গ্রাহকদের মতে, সর্বজনীন পেনশনব্যবস্থায় মানুষের আগ্রহ কম থাকার পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে ব্যাংকের আমানতের তুলনায় রিটার্ন কম হওয়া এবং পেনশন পাওয়ার আগে গ্রাহকের জন্য তাৎক্ষণিক সুবিধা কম থাকা অন্যতম।বিদ্যমান পেনশনব্যবস্থায় একবার কোনো স্কিমে যুক্ত হলে বের হওয়ার সুযোগ নেই। কেউ চাঁদা চালিয়ে যেতে না পারলে জমা টাকা ফেরত পাওয়ার সুযোগও থাকে না। এ নিয়ম পরিবর্তনের দাবি ছিল গ্রাহকদের পক্ষ থেকে।পর্ষদ সভার আলোচ্যসূচিতে এ নিয়ম পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, পাঁচ বছর চাঁদা জমা দেওয়ার পর শারীরিক বা আর্থিক কারণে অক্ষম হয়ে পড়লে পেনশনগ্রহীতাকে বিশেষ বিবেচনায় অর্থ উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হবে।কোনো পেনশনভোগী মারা গেলে তাঁর মনোনীত স্বামী বা স্ত্রীকে আজীবন পেনশন সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, চাঁদাদাতা মৃত্যুর আগপর্যন্ত আজীবন পেনশন পান। তিনি মারা গেলে পরিবারের অন্য কেউ আর পেনশন পান না। তবে ৭৫ বছর বয়সের আগে চাঁদাদাতা মারা গেলে তাঁর মনোনীত ব্যক্তি চাঁদাদাতার ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত যে সময় বাকি থাকে, শুধু সেই সময়ের জন্য পেনশন পান।পেনশন শুরুর বয়স ৫৫ বছর নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে পেনশন পাওয়ার নিয়ম রয়েছে।গত বছরের মে মাসে অনুষ্ঠিত কর্তৃপক্ষের দ্বিতীয় পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে পেনশন স্কিমে থাকা চাঁদাদাতাদের ৬০ বছর বয়স পূর্ণ হলে জমা করা অর্থের ৩০ শতাংশ এককালীন উত্তোলনের সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে এককালীন অর্থ উত্তোলনের কোনো সুযোগ ছিল না।সর্বজনীন পেনশন স্কিমে ইসলামি ভার্সন চালুর বিষয়েও আগামীকালের বৈঠকে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। সুদভিত্তিক ব্যবস্থায় থাকতে চান না—এমন গ্রাহকদের কথা বিবেচনা করেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।এ ছাড়া স্বাস্থ্যবিমা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে। কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, গ্রাহকদের কাছ থেকে মাসে ১০ থেকে ২০ টাকার মতো প্রিমিয়াম নিয়ে বিমা সুবিধা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।পেনশন স্কিমে নিবন্ধনের জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কমিশন বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমানে এ কমিশন ১৫ টাকা। তা বাড়িয়ে ২৫ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে।ব্যাংক, ডাক বিভাগ, মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানসহ (এমএফএস) অন্যান্য অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান এ কমিশন পাবে। এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমেই সর্বজনীন পেনশন স্কিমে গ্রাহক নিবন্ধন করা হয়।দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ও মুনাফার হার পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় রিজার্ভ বা কনটিনজেন্সি তহবিল গঠনের প্রস্তাবও আলোচ্যসূচিতে রয়েছে।পেনশন কর্তৃপক্ষের মতে, পেনশন তহবিলের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এ ধরনের তহবিল গঠনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে।জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান মো. সুরাতুজ্জামান বলেন, ‘প্রস্তাবগুলো পরিচালনা পর্ষদের সভায় উপস্থাপন করা হবে। পর্ষদ যেসব প্রস্তাব অনুমোদন করবে, সে অনুযায়ী আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে কার্যক্রম চালু করে দেব।’সর্বজনীন পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত হতে হলে ইউপেনশন ওয়েবসাইটে গিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনপ্রক্রিয়ার শুরুতে একটি প্রত্যয়ন পাতা আসবে। সেখানে আবেদনকারীকে ঘোষণা দিতে হবে যে তিনি সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত বা রাষ্ট্রায়ত্ত কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মরত নন এবং সর্বজনীন পেনশন স্কিমের বাইরে কোনো সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান থেকে সুবিধা গ্রহণ করেন না।এ ছাড়া তিনি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কোনো ধরনের ভাতা গ্রহণ করেন না—এ মর্মেও প্রত্যয়ন দিতে হবে।এরপর ‘আমি সম্মত আছি’ অংশে ক্লিক করলে দ্বিতীয় পাতায় গিয়ে নিবন্ধনপ্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। সেখানে আবেদনকারীকে প্রবাস, সমতা, সুরক্ষা বা প্রগতি—এই চার স্কিমের মধ্যে একটি বেছে নিতে হবে।একই সঙ্গে জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) নম্বর, জন্মতারিখ, মুঠোফোন নম্বর ও ই-মেইল ঠিকানা দিতে হবে। এরপর ক্যাপচা পূরণ করে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। ক্যাপচা দেওয়ার পর আবেদনকারীর মুঠোফোন নম্বর ও ই-মেইলে একটি ওটিপি বা একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন নম্বর পাঠানো হবে। ফরমে ওই নম্বর দেওয়ার পর নিবন্ধনের পরবর্তী ধাপে যাওয়া যাবে।