স্টাফ রিপোর্টার:
বীমার মেয়াদ শেষ হলেও পাওনা টাকা না পাওয়া, মেয়াদোত্তীর্ণ চেকের অর্থ পরিশোধ না করা এবং গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই বীমার পাওনা অর্থের একটি অংশ এফডিআর হিসেবে কেটে রাখার অভিযোগ উঠেছে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের বিরুদ্ধে। বছরের পর বছর ধরে এসব সমস্যার কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রাহক ও মাঠকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের নিম্ন আয়ের ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ দুধ, হাঁস-মুরগি বিক্রি, বাসাবাড়িতে কাজসহ বিভিন্নভাবে কষ্ট করে জমানো অর্থ বীমার কিস্তি হিসেবে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সে জমা দিয়েছেন। নিয়মিতভাবে কিস্তি পরিশোধ করলেও অনেক গ্রাহক পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও তাদের প্রাপ্য অর্থ হাতে পাননি। ফলে দীর্ঘদিন ধরে পাওনা টাকার জন্য বিভিন্ন দপ্তরে ধরনা দিতে হচ্ছে তাদের।
গ্রাহক ও মাঠকর্মীদের দাবি, সারা দেশে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের কাছে তাদের আনুমানিক ২০০ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে। এর পাশাপাশি গ্রাহকদের হাতে প্রায় ৬ কোটি টাকার মেয়াদোত্তীর্ণ চেক রয়েছে, যেগুলোর অর্থও এখনো পরিশোধ করা হয়নি বলে তারা অভিযোগ করেছেন। পাওনা টাকা আদায়ে ভুক্তভোগীরা বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) কাছে অভিযোগ করছেন। কোথাও কোথাও আদালতে মামলাও করেছেন বলে জানা গেছে।
এদিকে বীমা দাবির টাকা পরিশোধের দাবিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শতাধিক গ্রাহক ও মাঠকর্মী রাজধানীতে আইডিআরএ কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন, মিছিল ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। পরে তারা আইডিআরএ চেয়ারম্যানের কাছে স্মারকলিপি দেন। স্মারকলিপিতে দ্রুত বীমা দাবি পরিশোধসহ তিন দফা দাবি তুলে ধরেন তারা।
স্মারকলিপিতে গ্রাহক ও মাঠকর্মীরা অভিযোগ করেন, অনেক গ্রাহকের অনুমতি ছাড়াই তাদের পাওনা বীমার অর্থের ৩০ শতাংশ বা ৫০ শতাংশ এফডিআর হিসেবে কেটে রাখা হয়েছে। কিন্তু এফডিআর হিসেবে অর্থ কেটে রাখার পর অবশিষ্ট টাকার চেকও দেওয়া হয়নি। ফলে গ্রাহকরা একদিকে নিজেদের পাওনা অর্থ পাচ্ছেন না, অন্যদিকে আগে দেওয়া চেকের অর্থও ব্যাংক থেকে উত্তোলন করতে পারছেন না বলে অভিযোগ তাদের।
ভুক্তভোগীদের তিন দফা দাবির মধ্যে রয়েছে—পলিসির মেয়াদ শেষ হওয়া গ্রাহকদের পাওনা দ্রুত পরিশোধ, এফডিআর হিসেবে অর্থ কেটে রাখার পর অবশিষ্ট টাকার চেক দ্রুত দেওয়া এবং আগে দেওয়া বীমা দাবির চেকগুলোর অর্থ দ্রুত পরিশোধ করা।
গ্রাহকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে টাকা না পাওয়ার কারণে মাঠকর্মীরাও নানা ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক চাপের মুখে পড়ছেন। কারণ, অনেক গ্রাহক মাঠকর্মীদের মাধ্যমে বীমা করেছেন। পলিসির মেয়াদ শেষে কোম্পানি থেকে টাকা না পাওয়ায় গ্রাহকদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে মাঠকর্মীদের। কোথাও কোথাও তাদের অপমান-অপদস্থ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের মাঠকর্মী সালমা বেগম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি কোম্পানিটির সঙ্গে যুক্ত। তার মাধ্যমে অনেক মানুষ বীমা করেছেন। কিন্তু গ্রাহকরা তাদের পাওনা টাকা না পাওয়ায় এখন সেই চাপ ও ক্ষোভ তার ওপর এসে পড়ছে। গ্রাহকদের কাছ থেকে নানা প্রশ্ন ও অপমানের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলেও তিনি জানান।
পাবনা এলাকার একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেন, বীমার টাকা আটকে যাওয়ার কারণে তাদের অনেকেই এখন এলাকায় স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছেন না। বীমা করানোর জন্য তারাই গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। কিন্তু কোম্পানি টাকা পরিশোধ না করায় গ্রাহকদের কাছ থেকে তাদেরই নানা ধরনের গালিগালাজ শুনতে হচ্ছে। এর প্রভাব পারিবারিক জীবনেও পড়ছে বলে তারা জানান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নারী গ্রাহক জানান, ২০২১ সালে তার বীমা পলিসির মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু এখনো তিনি প্রায় ৬ লাখ টাকা পাননি। স্বামী মারা যাওয়ার পর সন্তানকে নিয়ে আর্থিক সংকটে রয়েছেন তিনি। পরিবারে আর কোনো উপার্জনক্ষম ব্যক্তি না থাকায় পাওনা টাকা তার জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। টাকা পাওয়ার আশায় ভাড়া খরচ করে বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে তাকে ধরনা দিতে হচ্ছে বলে জানান তিনি।
নোয়াখালী এলাকার ভুক্তভোগী আতাউর রহমান ওরফে সজীব অভিযোগ করেন, তার এলাকায় বহু গ্রাহকের টাকা সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সে আটকে রয়েছে। গ্রাহকদের পাওনা টাকার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে তার বিরুদ্ধেও চাঁদাবাজির মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তার অভিযোগ, সানলাইফের প্রধান কার্যালয়ে গ্রাহকদের পাওনা নিয়ে কথা বলার পর তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করা হয়।
স্মারকলিপিতে কোম্পানির অর্থ ও হিসাব বিভাগের দায়িত্বে থাকা রফিকুল ইসলামকে নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়েছে। গ্রাহক ও কর্মীদের দাবি, টাকা পরিশোধের জন্য বিভিন্ন সময় তারিখ দেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়ে অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। কোম্পানির মালিকপক্ষের সঙ্গে কথা বলে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান হয়নি বলে স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের উদ্যোক্তা পরিচালকদের শেয়ার বিক্রির উদ্যোগের খবর নিয়েও গ্রাহকদের মধ্যে আলোচনা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে। কোম্পানিটির মালিকানা পরিবর্তন হলে গ্রাহকদের পাওনা অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়বে, কোম্পানিটির গ্রাহকের দায় পরিশোধের আর্থিক সক্ষমতা কতটুকু এবং দায়ের বিপরীতে ঘাটতির পরিমাণ কত—এসব বিষয় নিয়েও ভুক্তভোগীদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের কেউ কেউ অতীতে অন্য বীমা কোম্পানির মালিকানা পরিবর্তনের পরও গ্রাহক হয়রানি বন্ধ না হওয়ার উদাহরণ তুলে ধরেছেন। তাদের দাবি, শুধু মালিকানা পরিবর্তন করলেই গ্রাহকদের সমস্যা সমাধান হবে না; আগে গ্রাহকদের পাওনা অর্থ পরিশোধের কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে পদ্মা ইসলামী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মালিকানা পরিবর্তন করা হলেও কোম্পানিটির গ্রাহক হয়রানি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগের পর ফারইস্ট ইসলামী লাইফের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয় পুঁজিবাজারের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। পরে কোম্পানিটির মালিকানা পরিবর্তন করে নতুন বোর্ড গঠন করা হলেও গ্রাহক হয়রানি বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান দায়িত্ব গ্রহণের পর একটি লাইফ বীমা কোম্পানির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বীমা কোম্পানিগুলোর গ্রাহকের টাকা পরিশোধে সমস্যার কারণ হিসেবে অতিরিক্ত ব্যয় ও মন্দ বিনিয়োগের কথা উল্লেখ করেছেন বলে জানা গেছে।
এ ছাড়া দেশের ১৭টি লাইফ বীমা কোম্পানির অতিরিক্ত ব্যয়ের বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) তদন্ত কমিটি গঠন করেছিল। ২০১৬ সালের জুনে এ তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। ওই সময়ে অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ পুনর্ভরণের অঙ্গীকার করেছিল সংশ্লিষ্ট লাইফ বীমা কোম্পানিগুলো। অভিযোগ রয়েছে, সানলাইফ ইন্স্যুরেন্স ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৮৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করলেও সেই অর্থ পুনর্ভরণ করতে পারেনি।
গ্রাহক ও মাঠকর্মীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বীমার টাকা আটকে থাকায় তারা চরম আর্থিক ও সামাজিক সংকটের মধ্যে রয়েছেন। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষের কষ্টার্জিত সঞ্চয়ের অর্থ আটকে যাওয়ায় অনেক পরিবার বিপাকে পড়েছে। তাদের দাবি, বীমা কোম্পানির সঙ্গে গ্রাহকের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নির্ধারিত সময়ে বীমা দাবি পরিশোধ করা। কিন্তু দীর্ঘদিনেও পাওনা অর্থ না পাওয়ায় তাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, দ্রুত তাদের পাওনা অর্থ পরিশোধ না করা হলে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন, অর্থ মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগসহ আরও কর্মসূচি নেওয়া হবে। একই সঙ্গে তারা আইডিআরএর কার্যকর হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
সানলাইফ ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধে গ্রাহকদের দায়ের করা মামলা এবং গ্রাহকদের পাওনার বিষয়ে কোম্পানি কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি।