স্টাফ রিপোর্টার:
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রশাসনিক বিধি লঙ্ঘন, টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন গ্রহণ, দ্বৈত দায়িত্ব পালন এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগে বেবিচকের কর্মকর্তা-কর্মচারী, প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে। অভিযোগকারীরা তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, জনপ্রশাসনের প্রচলিত নীতিমালা অনুযায়ী কোনো কর্মকর্তা সাধারণত একই পদে টানা তিন বছরের বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। অথচ এ এইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরী প্রায় সাড়ে পাঁচ বছর ধরে একই পদে বহাল রয়েছেন। শুধু তাই নয়, তিনি একই সময়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, সরকারি প্রশাসনিক কাঠামোয় এ ধরনের দ্বৈত দায়িত্ব পালন নিয়মবহির্ভূত এবং এটি স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করে।
অভিযোগ রয়েছে, নুরউদ্দিন চৌধুরী টেন্ডার প্রক্রিয়াকে নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করেন। বেবিচকের অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, কোনো দরপত্রে তার পছন্দের ঠিকাদার সর্বনিম্ন দরদাতা (লোয়েস্ট বিডার) না হলে সেই টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। গত জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত অন্তত সাতটি টেন্ডার এভাবে বাতিল করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রগুলোর দাবি, প্রতিটি বড় টেন্ডার থেকে প্রায় ১০ শতাংশ কমিশন গ্রহণ করা হয়। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি শত শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। যদিও এসব অভিযোগের কোনো সরকারি তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়নি।
বেবিচকের এক সহকারী প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে অভিযোগ করেন, একবার একটি টেন্ডার বাতিল না করে মূল্যায়নের (ইভ্যালুয়েশন) জন্য তিনি নুরউদ্দিন চৌধুরীকে অনুরোধ করলে তাকে বদলির হুমকি দেওয়া হয়। এ ধরনের ঘটনায় অনেক কর্মকর্তা ভীত হয়ে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য দিতে সাহস পান না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, নুরউদ্দিন চৌধুরী রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে থাকেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণেই তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বারবার পিছিয়ে যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের এক কর্মকর্তা জানান, তার বদলির বিষয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ার একটি প্রস্তাব তৈরি করলেও সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান সেটি কার্যকর করেননি। বর্তমান চেয়ারম্যানের কাছেও বিষয়টি উপস্থাপনে প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা অনীহা প্রকাশ করছেন। ফলে নানা অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তিনি এখনো একই পদে বহাল রয়েছেন।
আরও অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং আর্থিক প্রভাবের কারণে নুরউদ্দিন চৌধুরীর বিরুদ্ধে কেউ প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না। তার বিরুদ্ধে কথা বললে প্রশাসনিকভাবে হয়রানি কিংবা বদলির আশঙ্কা রয়েছে বলে দাবি করেছেন একাধিক কর্মকর্তা।
এদিকে হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে নুরউদ্দিন চৌধুরীর নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের এপ্রিল মাসে মন্ত্রণালয়ের এক সভায় তাকে ওই দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। তবে বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, তার নিয়োগের ক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতার নীতি অনুসরণ করা হয়নি এবং প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাইও যথাযথভাবে সম্পন্ন হয়নি।
সূত্র জানায়, এর আগে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগের ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনাপত্তিপত্র গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্বসহকারে অনুসরণ করা হয়েছিল। কিন্তু নুরউদ্দিন চৌধুরীর নিয়োগ নিয়ে এ বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ।
উল্লেখ্য, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প নিয়ে এর আগেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ওই প্রকল্পে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয়। দুদকের তথ্যমতে, প্রকল্প ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি, বিদেশি যন্ত্রাংশের নামে নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার, নকশা পরিবর্তন, মাটি পরীক্ষায় অনিয়ম, কমিশন বাণিজ্য এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি কাজ সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বণ্টনের অভিযোগ তদন্তাধীন রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি নীতিমালা উপেক্ষা করে দীর্ঘদিন একই পদে দায়িত্ব পালন, একই সঙ্গে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে বহাল থাকা এবং টেন্ডার প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার প্রশ্ন প্রশাসনিক জবাবদিহিতার জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত না হলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন বেবিচকের একাধিক কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগী। তারা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে অপসারণের দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এ এইচ এমডি নুরউদ্দিন চৌধুরীর মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে লিখিত বক্তব্য চেয়ে বার্তা পাঠানো হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তিনি কোনো জবাব দেননি।