স্টাফ রিপোর্টার:
২০১৫ সালে ‘আভিজাত্য’ ও ‘ইউরোপীয় মান’-এর প্রতিশ্রুতি নিয়ে দেশীয় স্যানিটারি পণ্যের বাজারে যাত্রা শুরু করে ‘সুইস গ্লোবাল’। সুইজারল্যান্ডের পতাকার লাল রঙ ও দেশটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ লোগো ব্যবহারের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রিমিয়াম গ্রাহকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চটকদার ফেসবুক বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি রাজধানী ও বাণিজ্যিক নগরীর অভিজাত এলাকায় বনানী, উত্তরা, কুড়িল, বাংলামোটর ও চট্টগ্রামসহ মোট পাঁচটি আউটলেট পরিচালনা করছে প্রতিষ্ঠানটি।
তবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক পরিচয়, পণ্যের মান এবং ব্র্যান্ডিং নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সুইজারল্যান্ডের পতাকা ও দেশটির পরিচিতি ব্যবহারের কারণে সাধারণ ক্রেতাদের একটি অংশ প্রতিষ্ঠানটিকে সুইজারল্যান্ডভিত্তিক ইউরোপীয় ব্র্যান্ড হিসেবে মনে করে উচ্চমূল্যে পণ্য কিনছেন। পরে পণ্য হাতে পাওয়ার পর কিংবা কিছুদিন ব্যবহারের পর পণ্যের মান নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করছেন অনেকে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির কিছু পণ্য চীন থেকে আমদানি করা হলেও সেগুলোকে সুইজারল্যান্ডের ব্র্যান্ডের পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
অভিযোগকারীদের মধ্যে বনশ্রীর নুসরাত জাহান নামে এক ক্রেতা রয়েছেন। তার দাবি, তিনি প্রায় সাত লাখ টাকার পণ্য কিনে প্রত্যাশিত মান ও সেবা পাননি। এ নিয়ে তিনি প্রতিকার পাওয়ার চেষ্টা করছেন। একইভাবে সামসুল আরেফিন নামের আরেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অনলাইনে অভিযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, পণ্য কেনার আগে ব্র্যান্ডের পরিচয় ও মান সম্পর্কে যেসব তথ্য তাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে, পণ্য ব্যবহারের পর তার সঙ্গে বাস্তব অভিজ্ঞতার মিল পাওয়া যায়নি।
অভিযোগকারীরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, ‘সুইস গ্লোবাল’ যদি সুইজারল্যান্ডের কোনো মূল ব্র্যান্ড বা সেখানকার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হয়ে থাকে, তাহলে সুইজারল্যান্ডে তাদের কারখানা, অফিস বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমের বিস্তারিত তথ্য জনসমক্ষে থাকা উচিত। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে পর্যাপ্ত ও স্পষ্ট তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির ব্র্যান্ড পরিচয়, পণ্যের উৎপাদনস্থল এবং আমদানি-সরবরাহ ব্যবস্থার বিষয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়িক পরিচয় ও পণ্যের উৎপাদনস্থল নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি কোম্পানির কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন মহলে আলোচনা তৈরি হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠান নিজস্ব কারখানায় পণ্য উৎপাদন করলে সেটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়। অন্যদিকে বিদেশ থেকে পণ্য আমদানি করে বা অন্য প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে পণ্য সংগ্রহ করে বিক্রি করলে সেটি মূলত ট্রেডিং বা আমদানিকারক ব্যবসার আওতায় পড়ে। ফলে কোনো প্রতিষ্ঠানের পণ্য কোথায় উৎপাদিত হচ্ছে, কোন দেশ থেকে আমদানি করা হচ্ছে এবং ব্র্যান্ডের মালিকানা বা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক কী—এসব তথ্য ক্রেতাদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা ব্যবসায়িক স্বচ্ছতার গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, গত ২৫ জুলাই তারা প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মানববন্ধন কর্মসূচির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তবে বিভিন্ন কারণে তারা কর্মসূচিটি করতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের কেউ কেউ দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে প্রভাবশালী লোকজনের মাধ্যমে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছিল। যদিও এ অভিযোগেরও স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর আওতায় কোনো পণ্য বা সেবা সম্পর্কে মিথ্যা, অসত্য বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে ক্রেতাকে প্রভাবিত করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটির পণ্যের বিজ্ঞাপন, ব্র্যান্ড পরিচয়, উৎপাদনকারী দেশের তথ্য, আমদানি-সংক্রান্ত কাগজপত্র এবং ক্রেতাদের কাছে দেওয়া তথ্য যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। একই সঙ্গে পণ্যের গায়ে ও মোড়কে উৎপাদনকারী দেশ বা ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ সংক্রান্ত তথ্য সঠিকভাবে উল্লেখ করা হয়েছে কি না, সেটিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা করার দাবি উঠেছে।
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কোনো বিদেশি দেশের পরিচিতি, প্রতীক বা ব্র্যান্ডিং ব্যবহার করে ক্রেতাদের মধ্যে ভুল ধারণা তৈরি করা হয়েছে কি না, তা তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত ব্যবসায়িক সম্পর্ক, ব্র্যান্ডের মালিকানা, পণ্যের উৎপাদনস্থল এবং চীন থেকে পণ্য আমদানির অভিযোগ—এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাইয়ের দাবি জানানো হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে তারা বিভিন্নভাবে প্রতিকার পাওয়ার চেষ্টা করলেও কাঙ্ক্ষিত সমাধান পাচ্ছেন না। তাই জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট তদারকি সংস্থার কাছে অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা এবং অভিযোগের সত্যতা না থাকলে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসায়িক পরিচয় ও পণ্যের উৎপাদনসংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে স্পষ্ট করার দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে সুইস গ্লোবাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।